XULHAZ & TONOY – Reminiscence

বরাবর, 

পৃথিবী

৩০ এপ্রিল, ২০১৬

আমাদের জীবনে মাঝে মাঝে এমন কিছু ঘটনা ঘটে, যা ঘটার পর কোন কিছুই আর আগের মতো থাকে না। দুদিন আগেও আমি জীবন কে যেভাবে দেখতাম তা আর আগের মতো নেই। সব বদলে গেছে। চোখের পলকে।

এই সপ্তাহে আমার দুজন বন্ধু মারা গিয়েছে। আসলে মারা গিয়েছে না বলে বলা ভালো মেরে ফেলা হয়েছে। মৃত্য ব্যাপারটা খুব কঠিন। কারো স্বাভাবিক মৃত্যু মেনে নিতেই আমাদের ভয়ানক কষ্ট হয়। আমার বন্ধুদের খুন করা হয়েছে পৈশাচিকতম উপায়ে। তাদের জবাই করে হত্যা করা হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই আমি ভালো নেই। আমার বন্ধুদের হত্যা করার কারণটি কিন্তু খুব সামান্য। আমার বন্ধুদের একমাত্র দোষ তারা LGBT অধিকার নিয়ে কথা বলতো। তারা ব্যাপারটা লুকোচুরির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি।তারা সরাসরি বলা ভালো প্রত্যক্ষ ভাবে এই অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে যুক্ত ছিলো।

আমার এই দু'জন বন্ধুর সাথে আমার পরিচয় LGBT এক্টিভিজম নিয়ে কাজ করার সময়। আমি এই এক্টিভিজম এ জড়িয়েছিলাম LGBT নিয়ে মানুষের ধারণা কে বদলে দেয়ার তুমূল আকাঙ্খা থেকে। কারণ আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই এর গ্রহনযোগ্যতা তৈরি করা সম্ভব। বলে রাখা ভালো, আমি নিজেও একজন সমপ্রেমী। আমি নিজে একজন নারী। প্রতিটি নারীর মতো আমিও ছোট্ট সুন্দর একটা সংসারের স্বপ্ন দেখি। পৃথিবীতে আমিও একটা প্রাণকে বড় করে তুলতে চাই। একটি শিশুকে বড় করে তুলতে চাই। তবে তা আরেকজন নারীর সাথে।

জুলহাজ ভাই একজন চমৎকার মানুষ ছিলেন। কনফিডেন্ট, ধীর স্থির, সাহসী এই মানুষটিকে আমার নিঁখুত মনে হতো। বিভিন্ন ইভেন্টে উনার আন্ডারে আমি কাজ করেছি। আর তনয়ের কথা কি বলবো? Full of talent একটা ছেলে। থিয়েটার করতো তনয়। আমি মুগ্ধ হয়ে সবসময় ওর কাজ দেখেছি। এমন অনেকসময় গিয়েছে পুরো ইভেন্টে আমি একাই মেয়ে। অনেকজন সমপ্রেমী পুরুষের থাকাটা একটা মেয়ের জন্য অবশ্যই নিরাপদ। কিন্তু বিব্রত যে লাগতোনা তা নয়। তনয়ের জন্য এ ব্যাপারটি আমি কখনোই অনুভব করিনি। আমি হয়তো একা এক কোণে স্মার্টফোন গুতাচ্ছি তনয় তখন আমাকে সংগ দিচ্ছে। এই ফিল্ডে খুব কম সংখ্যক মেয়ে থাকার অ্যাডভান্টেজ হিসেবেই বলেন আর আমি ব্যক্তিগত জীবনে একটু কিউট টাইপ দেখেই বলেন এই দুজন মানুষের অনেক আদর আমি পেয়েছি।

জুলহাজ ভার আর তনয়ের ঘটনা নিয়ে নিউজফিডে যখন ঝড় উঠছিলো তখন আমার পৃথিবী থমকে গেছে। আমার দেখা দুজন শ্রেষ্ঠ মানুষের শোকে কাতর হবো নাকি নিজেকে বাঁচাবো আমি ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। কাঁদতে কাঁদতে অনলাইনে খোঁজ নিলাম কোথায় পকেট নাইফ পাওয়া যায়। রাস্তায় বের হলে এক অজানা আতঙ্ক আমাকে চেপে ধরে। এই বুঝি কেউ চাপাতি নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে আসছে! দলবেঁধে কেউ আমার দিকে এগিয়ে আসলে আমার বুক কেঁপে উঠে। হৃৎপিণ্ড রেসের ঘোড়ার মত ছুটতে শুরু করে। নিজের বাসাতেও আতঙ্কে থাকি। আমার ছোট্ট একটা ভাতিজি আছে। ও হয়তো ডেক্সটার হয়ে যাবে, আমার মা কি সহ্য করতে পারবে আমার এহেন মৃত্য? জীবনের সবচেয়ে বড় আয়রনির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আমার বাবা মা সত্যিটা জানলে হার্ট ফেইল করে ফেলতে পারে। তথাকথিত লোকে কি বলবে এর যন্ত্রণায়। মেয়ে বিয়ে দেয়া এই সমাজে ফরজ। তারপর মেয়ে মানসিকভাবে কতটুকু বেঁচে আছে তার খোঁজ যদিও সমাজ কখনোই করবেনা। 

LGBT নিয়ে যারা কাজ করতো তাদের অনেকেই ফেসবুক প্রোফাইল বন্ধ করে, ফোন নম্বর বাসা বদলে ফেলে বেঁচে থাকার যুদ্ধে নাম লেখিয়েছে। এখন যা পরিস্থিতি মাথা তো কাটা পড়তেই থাকবে। আমি ঠিক জানিনা কবে আমরা এর থেকে বের হতে পারবো। 

আমাদের দেশের মানুষ গুলো খুব বিচিত্র। এদেরকে আমি ঠিক বুঝতে পারিনা। নিজে রাতে পর্ণ দেখে হাতের সুব্যবস্থা করতে ব্যস্ত মানুষ গুলো দিনের বেলায় সেলিব্রেটিদের বুকের মাপ খোঁজায় ব্যস্ত। সমপ্রেমী কাউকে মেরে ফেললে তাদের বাহবা দেয়ার ধরন দেখে ভাষা হারিয়ে ফেলি। দুনিয়াতে যেন শুধু তাদেরই বেঁচে থাকার অধিকার আছে। 

যাইহোক, এই ঘটনা ঘটার পর আমার কাছের যে কয়টি মানুষ আছে তারা সবাই আমাকে বলেছে দেশ ছেড়ে চলে যেতে। আমি ছোটবেলা থেকে অনেক বড় বড় স্বপ্ন দেখেছি কিন্তু নিজের দেশ ছেড়ে চলে যাবার স্বপ্ন কক্ষনো দেখিনি, কক্ষনো না। আমি ছোটবেলা থেকেই ভালো ছাত্রী ছিলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করেছি, ছাত্রাবস্থা থেকেই সামাজিক নানা কাজে যুক্ত ছিলাম। এখন ভালো চাকরী করছি। আমি সবসময় দেশের জন্য কিছু করতে চেয়েছি। সুবিধাবঞ্চিতদের সাথে কাজ করবো, দেশের ইকোনমিতে কন্ট্রিবিউট করবো অনেক আশা ছিলো আমার। কিন্তু আমি কেমন করে এ দেশে থাকবো যেখানে আমার বেঁচে থাকার নূন্যতম গ্যারান্টিটুকু নাই? আমি কেমন করে থাকবো এদেশে যেখানে আমি জানি আমি মরে যাবার পর হোমপেইজ, চায়েরকাপ সবখানে সোল্লাসে ঝড় উঠবে বেশ হয়েছে মরে গিয়ে দেশটাকে সাফ হয়েছে!! এ কেমন মাতৃভূমি? যার বুকে আমার জন্য এতোটুকু জায়গা নাই? 


আমার খুব ইচ্ছে করছিলো আপনাদের বলি আমার জন্য দোয়া করবেন, কিন্তু তার থেকে বেশি ইম্পরট্যান্ট আসলে এই দেশটার জন্য দোয়া করা। এখানে আমি ভালো নেই। আমরা ভালো নেই। 

ইতি, 

Buttertoes

২৫শে মার্চ।  

ছোট ছোট মোমবাতি দিয়ে পুরো ঘর সাজানো। কয়েকটা মেঝেতে। কয়েকটা কাঠের ওয়ারড্রবের উপর। ঘরের চার্ কোনায়  চারটা হলুদ স্পট লাইট জ্বলছে। মোমবাতি আর স্পট লাইটের আলো মিশে ঘরে অদ্ভুত এক ইন্দ্রজাল তৈরি হয়েছে। আজ কোনো মরিচ বাতি চোখে পড়ছে না। সবসময় এ বাড়িতে সব আয়োজনে রঙিন বাতির ছড়াছড়ি থাকে।সখিনার ঘর, জুলহাজ ভাই রং-তুলি দিয়ে দরজার বাইরে রীতিমতো লিখিয়ে নিয়েছেন এই বাড়ির নাম। আমরা বলি নানুর বাসা। আমাদের নানুর বাসা।

 সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। কেউ সোফায়। কেউ মেঝে। আর কেউ দাড়িয়ে আছে। মেঝেতে একজন হাত পা ছড়িয়ে লাশের মতো শুয়ে আছে। আরেকজন তার পাশে বসে নাকি সুরে কান্না করছে। যেন কেউ সত্যি সত্যি মারা গেছে। তার শোকে সে আসলেই ভীষণ কাতর।

 কিন্তু সবাই অভিনয় করছে! মজা করার জন্য ‘খালা যদি মরে যেতো’ নামে একটি সিটকম পরিবেশনের চেষ্টা করছিল ওরা। ‘খালা’র লাশের পাশে বসে তার চেনা-জানা মানুষেরা কেমন আচরণ করতো তা অভিনয় করে দেখানো হচ্ছিল। যাকে নিয়ে মজা করা হচ্ছিল তিনি আর কেউ নন খোদ জুলহাজ মান্নান। তিনি ঘরের এক কোণায় সোফার পিছনে পর্দায় হেলান দিয়ে মুখ টিপে হাসছিলেন। হাসি দেখে মনে হচ্ছিল তিনি জোর করে হাসছেন। নকল হাসি। তার চোখেমুখে হতাশার ছাপ এই মৃদু আলোতেও আমার নজর এড়ায়নি। তাকে সবাই আদর করে খালা ডাকতো। এখনও ডাকে। কারণ তার ভালোবাসা আর শাসন ছিল খালার মতন।    

 ঠিক এক মাস পর ২৫শে এপ্রিলের ঠিক ঐসময়টায় তিনি খুন হন। নিজ বাসায়। নৃশংসভাবে। দরজার সামনে। ঠিক এক মাস পর! 

 সেদিন তার মৃত্যু নিয়ে যখন মজা করা হচ্ছিল, কেউ ঘুনাক্ষরেও ভাবেনি  এতো দ্রুত সেই নাটকের বাস্তবায়ন হতে চলেছে। এযেন কোনো মহা ট্রাজেডি এর পুর্ব মঞ্চায়ন। 

   ২৫শে মার্চ আমি শেষবারের মতো জুলহাজ ভাইয়ের বাসায় পা দিয়েছিলাম। এক জন্মদিনের উৎসবে। তিনি তার কাছের  বন্ধুদের জন্মোৎসব নিজের বাসায় করতে পছন্দ করতেন। প্রায় তিন মাস পর সে বাড়িতে যাওয়ার কারণে আমার মধ্যে অন্যরকম অনুভূতি কাজ করছিল। দূরত্ব দূরত্ব ভাব। যেন তিন মাসেই সব ধরণের সম্পর্ক ছিঁড়ে তন্নতন্ন হয়ে গেছে। তবে বাসার পরিস্থিতি বদলায় না। কেবল মানুষ বদলায়। পুরনো চলে যায়, নতুন কেউ আসে। কেউ টিকে কয়েক মাস, কেউ টিকে কয়েক বছর। আবার কেউ টিকে একটি মাত্র দিনের জন্য। বাসায় দেখতে পেলাম সব চেনা পরিচিত মুখ।  

 সেদিন জুলহাজ ভাইয়ের সঙ্গে কথা হয়েছে তিন বাক্যে। কিছু জিজ্ঞাস করলেও উদাসীন ভঙ্গিতে জোর করে উত্তর দিচ্ছিলেন। পুরোটা সময় মুখ ভার করে ছিলেন। আমি প্রায় মজা করে বলতাম, দু পেগ মদ পেতে না পড়লে জুলহাজ ভাই হাসতে পারে না! তিনি অবশ্য সে মজা কোনোদিন ভালোভাবে গ্রহণ করেননি। উলটো ধমক দিতেন!

   ড্রয়িং রুমে তার মৃত্যু নিয়ে মজা করা সময় আমি তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আমি মানুষের চেহারা পড়তে পারি না। সেদিন পড়ার চেষ্টা করেছিলাম। আচ্ছা সেদিন কি তিনি একবারও কি তার মৃত্যুর কথা সত্যি সত্যি কল্পনা করেছিলেন?  

ঠিক এক মাস পর তার মৃত্যু হল। 

 মাঝেমধ্যে আমি হিসাব করতে বসি। কতো দিন হল? ১০ দিন? ১৫ সপ্তাহ? ৬ মাস? আর কতো মাস পর এক বছর হবে?  

 প্রথম প্রথম ঘোরের মধ্যে ছিলাম। ঠিকমতো বুঝতে পারছিলাম না জীবনে কতো বড় পরিবর্তন চলে এসেছে। যখন ঘোর কাটিয়ে একটু-আধটু বোঝার চেষ্টা করতে শুরু করলাম তখন বড় বড় দীর্ঘনিঃশ্বাস বুকে জমতে শুরু করলো। আমাদের পুরো জগত বদলে গিয়েছে। আচমকা এক ঝড়ে সব লণ্ডভণ্ড করে গিয়েছে।  

 ২০১৬ সালের ডিসেম্বর মাসে জুলহাজ আর তনয়ের স্মরণে লিখতে বসবো সেটা কল্পনা তো দূরের কথা, ভুলে ভাবতেও পারিনি। মৃত্যু নিয়ে আমি কখনই ভয় পেতাম না। নিজেদের অধিকার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে কখনও মনে হয়নি সাংঘাতিক কিছু ঘটতে পারে। যখন কাছের আপন মানুষজন মুহূর্তেই খুন হল তখন বুঝলাম নিষ্ঠুর দুনিয়ায় সবই সম্ভব।  

সুখের ঘটনা লিখতে বসে দুঃখের গীত শুনাচ্ছি। অবশ্য জোরজবরদস্তি করে স্মৃতিচারণও করা হয় না। অনেক সময় হাজার হাজার শব্দ মাথায় ঘুরে কিন্তু লিখতে ইচ্ছে করে না।  

 জুলহাজ ভাইকে চিনি প্রায় আড়াই বছর হবে। এক অনুষ্ঠান করতে গিয়ে তার সঙ্গে পরিচয়। আমি ‘প্রণয়নামা’ অনুষ্ঠানে জন্যে একটা নাটক লিখেছিলাম। তারা আমায় বলল নাটকের কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করতে। আমি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হই তবে আমার ধারনায় ছিল না কিসে রাজি হলাম! যখন রিহার্সাল শুরু করলাম তখন কোন কূলকিনারা পাচ্ছিলাম না। কিভাবে করবো? নাটকে মাত্র দুটো চরিত্র। আমার সাথে যে অভিনয় করবে তাকেও আমি চিনি না। এই দুর্দিনে আমাদের উদ্ধার করলেন জুলহাজ ভাই। তিনি নাটকের দিকনির্দেশক হিসেবে আবির্ভূত হলেন। তখন থেকেই তার সঙ্গে পরিচয়। অনুষ্ঠানের কয়েক সপ্তাহ পরে আমরা সবাই গেলাম বান্দরবানে। সম্পর্কে দারুণ উন্নতি ঘটলো!  

 এরপর রূপবানে ঢুকলাম। দেড় বছর কাজও করলাম। তখন ব্যক্তিগত সম্পর্ক পুরোপুরি কাজে রুপান্তরিত হল। তবে তার সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি ‘রূপঙক্তি’তে। ২০১৫ সালে জানুয়ারী মাসের প্রথম সপ্তাহে জুলহাজ ভাই ঘোষণা দিলেন তিনি সমপ্রেমীদের নিয়ে একটা কবিতা সংকলন বই আকারে বের করতে চান। যৌন সংখ্যালঘুদের কবিতাই এখানে প্রাধান্য পাবে। তিনি তার দায়িত্ব দিলেন আমার উপর। আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। বইমেলা হল সামনের মাসে! একমাসে কাজ শেষ করবো কি করে? আর হাজারো ঝামেলা তো আছেই। অনুরোধে ঢেঁকি গেলার মতো দায়িত্বটা নিজের মাথায় চেপে বসালাম। মনে মনে বললাম, এবার মরতে নামলাম!  

বিজ্ঞাপন বানাও, মানুষদের কবিতা দেওয়ার জন্য গুঁতাগুঁতি করো, কবিতা যাচাই করো সবমিলিয়ে আমি হিমসিম খাচ্ছিলাম। এপ্রিল মাসে আমার এইচ এস সি পরীক্ষা আর আমি এখন বসে বসে কাজ করি!  তবে প্রতিটি সময় তিনি আমার সাথে ছিলেন। আমাকে যথাসাধ্য সাহায্য করেছেন। আবার মনোমালিন্যও হচ্ছিল। আমাদের কাজের মধ্যে অমিলগুলো ঝিলিক মেরে উঠছিল। ফলাফলঃ কথা কাটাকাটি! শত বাধা পেরিয়ে আর তনয়ের শেষ মুহূর্তের অসাধারণ সাহায্যে কবিতার সংকলন বের করতে সক্ষম হই আমরা। তবে আমি মোড়ক উন্মোচনে যাই নি। আমাকে একবারও ডাকা হয়নি। মোড়ক উন্মোচনের আগেরদিন অভিজিৎ রায়কে হত্যা করা হয়েছিল। এরপর কি আমি ভয় পেয়েছিলাম? জী, উনিশ বছরের ছেলে নিজের জীবনের ভয় পাচ্ছিল না। পাচ্ছিল নিজেদের নিয়ে। তারপরও মোড়ক উন্মোচিত হয়। সম্পাদক হিসেবে কাজ করেও শেষমেশ সামিল হতে পারলাম না। তারপরের দিন রূপবান ইউথ লিডারশীপ প্রোগ্রামের সার্টিফিকেট দেওয়া হবে ব্রিটিশ হাই কমিশনারের বাসায়। আমাকে জুলহাজ ভাই বললেন স্যুট-প্যান্ট পরে চলে আসেন! আমি বারণ করেছিলাম। আমি বলেছিলাম আজ ২৮শে ফেব্রুয়ায়ি। আজ শেষ দিন বইমেলার। আমি আজ যাবো, নিজ হাতে বইটি কিনবো। নিজের নামখানা দেখবো। আমিই তাই করেছিলাম। বইমেলা থেকে ফিরে এসে দেখি রাতে ওখানেও মোড়ক উন্মোচিত হয়। শুধু আমি ছিলাম না।  

 আবার ঠিক একমাস পর ‘কবিতা পাঠের আসর’ আয়োজন করা হয়। আমাকে উপস্থাপক আর আয়োজক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। তখন অনুরোধে ঢেঁকিও নয়, রাইস মিলও নয়, যেন হাজার বস্তা চাল গিলে বসলাম। অনুষ্ঠানের তারিখ ছিল ২৫শে মার্চ, ২০১৫!

  আবার কাকতালীয় হয়ে গেলো ব্যাপারটা। তাই নয় কি?  

 গেলো তো কাজ করার স্মৃতি। এখন বলি কাজের বাইরের কথা। আমি হাতেগোনা খুব অল্প সময় কাটিয়েছে তার সঙ্গে। তবে কাটানো সব মুহূর্তই আমার প্রিয়। আমরা দুজনই অতিমাত্রার বৃক্ষপ্রেমিক। প্রায় বেশিরভাগ সময় গাছ নিয়ে কথা হতো। ২০১৫ সালে জুলাইয়ের কথা। রোজার মাস। আমি এইচ এস সি পরীক্ষার ঝামেলা চুকিয়ে অনেকদিন পর তার বাসায় গেলাম। সকাল থেকে গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে। গত এক সপ্তাহ ঢাকা শহর পানিতে ভেসে গেছে। আমি তাকে বারবার বলে রেখেছিলাম বৃক্ষমেলায় যদি যাই তাহলে একসঙ্গে যাবো। তিনি কথা ফেলে দেননি। আমি মাঝেমধ্যে তার বাসায় গেলে গাছের চারা নিয়ে যাই। অবশ্য সবসময় না। সেদিন কিছুই নেইনি। কারণ আজ তো ব্যাপক গাছ কেনা হবে! 

 বাসায় ঢুকতে না ঢুকতেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামলো। তিনি আর আমি ড্রয়িং রুমে বসলাম। এই ঘরের জানালা দিয়ে তার কিছু গাছ দেখা যায়। আমরা দুজনে উপুড় হয়ে গাছ নিয়ে গবেষণা শুরু করলাম। তিনি তার ঝুল বারান্দার বাইরের সানসেটের উপর অনেকদিন ধরে ঘাস লাগাতে চাচ্ছিলেন। সময়ের অভাবে পারছেন না। তার মাল্টা গাছ দিন দিন বেড়েই চলছে কিন্তু ফল আসার নাম নেই। এদিকে সাদা গুলাচি গাছের এক গুচ্ছ ফুল উনার মা নাকি সেদিন পোকা লেগেছে বলে কেটে ফেলে দিয়েছেন। এরকম কত না বলা গল্প জমে ছিল উনার বাগানটার আনাচে-কানাচে। সময়মতো কাউকে পেলে সেগুলোর ঝাঁপি খুলে বসতেন তিনি। প্রত্যেকদিন সকালে উঠে অফিসে যাবার আগে হোস-পাইপে পানি করে সব গাছে পানি দেয়া উনার দৈনিক রুটিন ছিল। গাছগুলো এখন কেমন আছে কে জানে! 

 সেদিন বাসায় তিনি তার অনার্সের সময়কার ঘটনা হঠাৎ করেই বলতে লাগলেন। আমি কখনই জোরজবরদস্তি করে তার জীবনের কাহিনি জানতে চাইনি। যখন তার মনে হতো তখন টুকরো টুকরো ঘটনা শুনাতো। আমি জানতাম না তিনি রেসিডেন্সিয়াল স্কুলে পড়তেন। আমার নানা সেখানকার শিক্ষক ছিলেন এবং জুলহাজ ভাই তাকে চিনতেন। তবে তিনি বেশি একটা ক্লাস পাননি তাই ঝাপসা ঝাপসা দু একটা কথা এখনও মনে আছে।  

 গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যেই বেরিয়ে গেলাম বৃক্ষমেলার উদ্দেশ্যে। রোজার মাস, ইফাতারের আগেই বাসায় পৌছাতে হবে। রিক্সা ঠিক করে কিছুদূর পেরুতেই দেখলাম রাস্তা পানিতে ভেসে গেছে! জুলহাজ ভাই পানি দেখে হেসে বললেন, কুয়াকাটা ট্রিপে তোমার যাওয়া উচিত ছিল! রাতের বেলায় ওরা ডাকাতের ভয়ে ঘুমাতে পারেনি। সব ঘুরঘুর করে রাতে ঘুরে বেড়িয়েছে। একজন তো সিঁড়ি দিয়ে রঙঢঙ করে উঠতে গিয়ে পিছলে পড়ে গেছে। আমি তো কিছুই জানতাম না। সব সকালে উঠে শুনেছি! হঠাৎ করে সুনসান নীরবতা। কথা বলার জন্য কোন বিষয় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। তিনি মাঝে মাঝে কিছু প্রসঙ্গ তুলার চেষ্টা করেন, আমি হা-হু করে জবাব দেই। আমরা কখনও একনাগাড়ে কথা বলতে পারতাম না। ১০-১৫ মিনিট পর আপনাআপনি কথার খেই হারিয়ে ফেলতাম। আর নিজের অতি ব্যক্তিগত ব্যপার নিয়ে কখনও কথা হতো না। রিক্সা থেকে নেমে দ্রুত হেঁটে গেলাম মেলার ভিতর। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছে এরমধ্যেই একের পর এক গাছ দেখেই যাচ্ছি। অবশেষে প্রায় পনেরোটার বেশি গাছ কিনে আবার রিক্সায় উঠলাম।

  ঝুমিয়ে বৃষ্টি নামলো।  

 এতোগুলো গাছ নিয়ে দু’জন রিক্সায় জড়সড় করে বসার ছাড়া উপায় ছিল না। আমার এখনও সেই দৃশ্য মনে পড়ে। সারা রাস্তা জুড়ে আমরা রাজ্যের ব্যাপার নিয়ে আলাপ করেছি। তখন মাত্র এইচ এস সি পরীক্ষা শেষ হয়েছে, বাসা থেকে মেডিকেলে পড়ার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল। আমি পড়তে চাই না তবুও বাবা-মা মানতে নারাজ। সে নিয়ে আমি প্রায় জুলহাজ ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতাম। তিনি কখনও পরামর্শ দেননি। হঠাৎ কথা বলতে বলতে তিনি আমায় বলেছিলেন, আসলে বাবা-মারা চায় সন্তানের ভালো হোক তবে আমি জানি তাদের সব আবদার পূরণ করা সম্ভব হয় না। তুমি যেটা চাও সেটাই পড়ো , প্রেসার নিও না। যেটা পড়ে  তুমি তোমার মতো হতে পারবে তাই তোমার করা উচিত। 

 সেদিন তিনি আমাকে সারাদিন তুমি করে ডেকেছিলেন। 

 তার সঙ্গে পরিচয় হবার পর সেই একদিন তিনি আমাকে তুমি বলে ডেকেছিলেন। তিনি সবসময় আমাকে আপনি ডাকতেন, সেদিন নিজের নিয়ম ভঙ্গ করেছিলেন!

 মাঝেমধ্যে নিয়ম ভঙ্গ করে মানুষ প্রমাণ করে তারা নিজেদের থেকে একটু হলেও অবসর চায়। তিনি আজ নেই ভাবতে কষ্ট লাগে। তিনি আমাকে শিখিয়েছিলেন কিভাবে নিজের যোগ্যতা নিজে যাচাই করে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়। 

মাঝেমধ্যে সকালে উঠে দেখতাম ফেসবুকে তিনি মেসেজ দিয়েছেন। ম্যাডোনার গানের লিংক। তিনি অসম্ভব ভক্ত ছিলেন। তিনি প্রায়ই বলতেন ম্যাডোনার 'ভোগ' গান শুনতে শুনতে তার মৃত্যু হবে। 

 আমি জানি না সেদিন তিনি সারাদিনে একবারো গানটা শুনছিলেন কিনা। 

জুলহাজ আর মিরাদের গল্প

-----------------------------

সিএঞ্জিতে আমরা তিনজন, কারোর মুখে কোনো কথা নেই। ফার্মগেট পার হয়ে  নাখালপাড়ায় উঠতেই থ্রি-হুইলারের ছোট্ট কামরায় ভূমিকম্প শুরু হয়ে গেল। ইফতারের আগে আগে খালি রাস্তা পেয়ে সিএনজি দুই পাশের দুই পাখাতে ভর করে মাটি ছেড়ে আকাশে উড়াল দিল। সাই সাই করে পায়ের নিচে দিয়ে একদল টোকাই, কয়েকটা রিচার্জের দোকান, রেন্ট ই কার, বাসের ডিপো, সারি সারি ডাস্টবিন আর কত কি যে হারিয়ে গেল। চামড়ার নিচের পাঁজরটায় একবার হাত বোলালাম। কারোর মুখে কোনো শব্দ নেই, বোবা উত্তেজনা চামড়া কামড়ে ধরেছে।বহু নাটক আর অনিশ্চয়তার পর আজ রূপবানের দ্বিতীয় সংখ্যার ডেলিভারি আনতে যাচ্ছি আমরা তিনজন। গত সাত মাস ধরে রূপবানের দ্বিতীয় সংখ্যার সফট কপি পেন ড্রাইভে ভরে  বুকপকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমাদের আগের ছাপাখানা রূপবান ছাপাতে পারবে না বলে দিয়েছে। সাত মাস ধরে একের পর এক ছাপাখানায় ধরনা দিচ্ছি, কেউ রূপবান নিতে রাজি হচ্ছে না। একদিন জুলহাজ ফোন করে বলল মণট্রিসভায় প্রধানমন্ত্রীকে রূপবান দেখানো হয়েছে, সাবধান। এরপর আবার ভোরের কাগজে রিপোরর্ট এলো গোয়েন্দারা নাকি আমাদের খোজে। ভয়ে কুকড়ে যাই, তারপরেও বুকপকেটের পেন ড্রাইভটা হারাই না। জুলহাজ একদিন না পেরে বলে বসলো, চল পিডিএফ করে অনলাইনে দিয়ে দেই।

জুলহাজ আমার পাশে বসে আছে। গায়ে হালকা বাদামী কুর্তা কাটের শার্ট আর ফর্মাল প্যান্ট। অফিস থেকে সোজা সিএঞ্জি নিয়ে নাখালপাড়া। ওর মুখের দিকে একবার কি তাকিয়েছিলাম? মনে হয় না। আমাদের যোগাযোগের ধরনটা আমি কোনোদিন কাউকে ঠিকঠাক বলে বোঝাতে পারবো না।। আমরা দুজন দুজনের যত কাছাকাছি আসি, তত আমাদের কথা বলার বিষয় ফুরোতে থাকে। একজন আরেকজনের দিকে তাকাই না, বিশেষ আন্তরিকতা দেখাই না। অথচ  দুজন দুজনের উপস্থিতির প্রতি কৃতজ্ঞ, দুজন পাশাপাশি প্রচন্ড নির্ভার। আমি তাই ওর চোখের দিকে বিশেষ তাকাই না, তাকালে হয়ত ওর চামড়ার কামড়টা টের পেতাম ।

'অমুক' টিভিরর অফিসের সামনে সিএঞ্জি থেকে নামলাম। তারপর? মনে নেই। জুলহাজ এর পকেটে কি ওইদিন ভাংতি ছিলো না? আমার একটামাত্র টিউশনিটাও  তখন আর নেই। পকেট ফাঁকা। আমি অপেক্ষা করছি জুলহাজ সিএঞ্জির পুরো ভাড়াটা দিয়ে দিবে। ও কি আমার কাছে ভাংতি চাচ্ছে? কিন্তু আমার কাছে তো টাকা নেই। কি লজ্জা! ওর মুখের দিকে তাকাইনি। তাকালে হয়তো  ওর কামড়টা টের পেতাম।
এর মধ্যে মাগরিবের আযান শুরু হয়ে গেলো।
আমরা দুজন বহু মাগরিবের আজান পাশাপাশি থেকে শুনেছি। ঐদিন রুপবানের দ্বিতিয় সংখ্যার ডেলিভারির দিন  না হলে হয়তো কোনো কারন ছাড়াই ওর বাসায় চলে যেতাম। কেউ কারো দিকে না তাকিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা  পার করে  দিতাম।ও হয়তো গুন গুন করে গান ধরতো, কাপড় বদলাতো, অফিস থেকে ফিরে এসে ঝাঁটা  হাতে সারা বাড়ি চষে বেড়াতো। আতঙ্কিত আমি ঘরের যে কোনায় গিয়ে লুকোতে চাইতাম , সেখানেই ঝাড়ু হাতে পৌঁছে  যেতো  জুলহাজ, ওর মুখের দিকে না তাকিয়েই শুনতে পেতাম সেই অমোঘ নির্দেশ,

-পা-ওঠাও, ওখানে ময়লা। 

ও আমার দিকে তাকায়নি কিংবা আমিও ওর দিকে না, তবুও দুজন দুজনের উপর সমান ভাবে বিরক্ত। পা ওঠাতে ওঠাতে ওর গুন গুন গানের কলিগুলো মাগরিবের আযানের সাথে মিলে মিশে একাকার, যেন মোসুমির প্রেতাত্মা গাইছে, 

-কিছু ফেলতে পারি না!

সিএঞ্জি চলে যাচ্ছে । জুলহাজ ভাংতি কোথায় পেল? আসলেই কি ওর ভাংতি ছিল না ঐদিন নাকি এতদিনের স্মৃতি হাতড়ে তলা থেকে কেবল মরীচিকা  তুলে আনছি? ওসব চুলোয় যাক, আমরা সামনে এগোই। কারণ আমি জানি একটু পরে আমরা আমাদের ছাপাখানায় যাবার রাস্তাটা হারিয়ে ফেলবো। এখানে এর আগেও অনেকবার এসেছি আমরা। রূপবানের গুপ্ত প্রেস। এখানে লোকচক্ষুর অন্তরালে ভীষণ গোপনে রূপবানের দ্বিতীয় সংখ্যার মুদ্রণ চলছে। সেই নিয়ে গত সাত মাসে কত নাটক। রূপবানের শুরুতে আমাদের ইচ্ছা ছিল বছরে তিনটা সংখ্যা। অন্যান্য ম্যাগাজিনের মত রূপবানের প্রথম সংখ্যার পর  দ্বিতীয় প্রকাশ কিছুটা মসৃণ হবার কথা ছিল। কিন্তু আমাদের কপালে শনি,  চারপাশ থেকে অক্টোপাসের অশুভ শুড় আমাদের আশ্ঠেপরিশটে বেধে ফেলল। প্রধানমন্ত্রী নাকি মন্ত্রীসভার স্ট্যান্ডিং কমিটিতে রূপবান দেখে নাখোশ হয়েছেন। এদিকে ভোরের কাগজে বড় করে রিপোর্ট বের হয়েছে গোয়েন্দা বাহিনী রূপবানের পেছনের লোক খুজছে। রূপবানের দ্বিতীয় সংখ্যা এপ্রিলে বের হবার কথা থাকলেও যেহেতু আমরা পৃষ্ঠা বাড়িয়েছি, তাই মে মাস লেগে গেলো লে-আউট শেষ করতে করতে। যেই না কাজ গুটিয়ে প্রিন্টিং এ যাবো যাবো, তখনই এই অঘটন।রুপবানের প্রথম সংখ্যা বের হয়েছিল যে ছাপাখানা থেকে, ভোরের কাগোজের রিপোর্ট বেরোবার পরের দিনই জানিয়ে দিলো তারা আর আমাদের ম্যাগাজিন ছাপাতে পারবে না।আমি তখন নিতান্তই ভেঙে পড়েছিলাম। রূপবান ছাপানোর শোকে না, ডিবি পুলিশের ভয়ে! বাসায় কলিংবেল বাজলেই মনে হয় পুলিশ। রাস্তায় কেউ পেছোনে হাটলে মনে হয় গাড়িতে করে তুলে নিয়ে গুম করে ফেলবে। মনে মনে প্রত্যেকদিন ডিবি পুলিশ ধরে নিয়ে গেলে কি বলব তার রিহার্সেল করি আর ভাবি সব জানাজানি হলে আমার মা-টার কি হবে। ইচছা করে ইউনিভার্সিটির ক্লাশ ফাঁকি  দেই কারন ওখানে সবাই যেনে গেছে আমি ‘গে’ ম্যাগাজিন করি।এর মধ্যে একদিন দেখি তসলিমা আমার ম্যাগাজিন নিয়ে টুইট করছে। হয়ে গেলো রূপবান নাস্তিকদের পত্রিকা!

এখনো মাগরিবের আযান শেষ হয়নি। আমরা আমাদের প্রেস এখনো খুঁজে  পাইনি।। এটা ঢাকা-এর বেশ পরিচিত মুদ্রণ পাড়া। আশেপাশে সারি সারি একই ঢঙের  প্রিন্টিং প্রেস। এর আগে যে কবার এসেছি, তখন আশে পাশের সব দোকান খোলা ছিল।ঈদ এর তিনদিন আগে এখন সব বন্ধ।আমাদের প্রেসটা চেনার আর কোনো উপায় নেই। আমি মোবাইলের দিকে হাত বাড়াই। ডায়াল লিস্ট থেকে সবুর ভাইকে খুঁজে  বের করি।

মে মাস কেটে গেলো আতংকে। বাসার কম্পিউটার থেকে রূপবানের যাবতীয় জিনিস আরেকটা হার্ড ড্রাইভে ভরে অন্য এক বন্ধুর বাসায় রেখে আসলাম। জুলহাজ এরমধ্যে একদিন মেসেজ দিল,

-তোমার কম্পিউটারে গে পর্ন আছে? ডিলিট ইট ইমেডিয়েটলি। পুলিশ আসলে কোনো ঝামেলা করবা না। কোনোকিছু অস্বীকার করবা না। চুপচাপ থানায় যাবা। ওখানে গিয়ে সবার আগে আমার নাম বলবা। বলবা জুলহাজ মান্নান সব নাটের গুরু।

-সবুর ভাই, আমরা আপনার অফিস খুঁজে পাইতেছি না, একটু 'অমুক' টিভির ওখান থেকে আমাদের নিয়ে যান না। 

-আরে ভাই, আমি তো ইফতার করি। দাঁড়ান কাউরে পাই কিনা। পাঠাইতেছি।

আজানটা শেষ হয় না কেন!। জুলহাজের ঘর গোছানো তো শেষ। আমরা একটা শব্দ বিনিময় না করে, কেউ কারোর দিকে একবারো না তাকিয়ে একজন আরেকজনের সঙ্গ উপভোগ করে যাচ্ছি । জুলহাজ ওর আলমারি খুলে কয়েকটা মোম বের করে ওর বারান্দায় রাখা বড় কালো পদ্ম রাখা গামলায় ভাসিয়ে দিলো। মোমের কাচা পাকা আলোয় পদ্মপাতার নিচে কিলবিল করতে থাকা মাছগুলো কিছুক্ষণ পরপর দিকভ্রান্ত হয়ে গামলায় ঢুশ-ঢাশ বাড়ি খাচ্ছে । আমি ওর দিকে না তাকিয়েও সব দেখতে পাই। কিছুক্ষনের মধ্যে পুরো ঘোর ভরে গেলো ল্যাভেন্ডারের মাতাল ঘ্রাণে। র্ং, আলো আর ঘ্রাণের প্রতি ওর যে বাড়াবাড়ি বাতিক ছিলো, সেটা কি এখনো আছে? জুলহাজ একটা তোয়ালে নিয়ে গোসলে ঢুকে যাচ্ছে।

মে মাসের ভয় মে মাসেই পড়ে রইলো। জুন আসতেই পকেটের পেন ড্রাইভ বুকের বা পাশটা কামড়ে ধরল। লে-আউট তৈরি, প্রুফ রিডিং শেষ, ভয় যা পাওয়ার পেয়ে গেছি, এবার ছাপানোটা কেবল বাকি। কিন্তু ছাপাবে টা কে? আমরা তিনজন হন্যে হয়ে ছাপাখানা খুঁজছি কিন্তু কেউ রাজি হচ্ছে না। বুকের কামড়টা একদিন গর্ত হয়ে গেল যখন জুলহাজ হতাশ হয়ে বলল, চলো এটা পিডিএফ করে অনলাইনে দিয়ে দেই। ওর মুখের দিকে তাকালে হয়তো ওর হতাশাটা বুঝতে পারতাম। একটা পিডিএফ ম্যাগাজিন ডিজাইন করতে যে কয়দিন লাগে, তার দশগুন কাজ করে কাগজে ছাপা হবে বলে রাতদিন খেটেখুটে যে লে-আউট দাঁড়া করিয়েছি, সেটা এভাবে অনলাইনে দিয়ে দেবো? জুলহাজের উপর খুব রাগ হলো, গাধার খাটনিটা আমায় খাটতে হয় বলে কি সেটা এভাবে হেলায় ফেলে দিবো! !  ছুটলাম অভিদার কাছে, অভিজিৎ রায়। উনি চোখ বুজে পাঠালেন টুটুল ভাই- এর শুদ্ধস্বরে। তখনো জানি না যে এদের সবাইকে গিলে খেতে কি এক বুনো অজগর  অন্ধকারে ওঁৎ পেতে ছিল।

আজান শেষ। পাশের অন্ধকার গলি থেকে হঠাৎ সবুর ভাই বেরিয়ে এলো। খাটো করে পেট মোটা লোকটার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। বেচারার হাতে এখনো ঘুগ্নি মাখানো মুড়ি লেগে আছে। কাউকে খুঁজে না পেয়ে নিজেই ইফতারি ফেলে আমাদের এগিয়ে নিতে এসেছে। মুখের দিকে তাকালাম, সেখানে ঈদের দুদিন আগেও প্রেস খুলে রাখার বিরক্তি স্পষ্ট। সে বারবার বলছিলো যে আমাদের জন্য ঈদে বাড়ি যাবার টিকেট পায়নি, এখন মাইক্রো ভাড়া করে যাওয়া লাগবে। চাপটা আসলে আমরাই দিচ্ছিলাম। খুব চাচ্ছিলাম ঈদ এর দিন রূপবান বের করে সবাই মিলে একটা অন্যরকম ঈদ করবো। গত সাত মাস ধরে আমরা একসাথে যে ম্যাগাজিন কন্সিভ করেছি, তাকে চূড়ান্ত আকারে দেখার উত্তেজনায় আমাদের সবার তখন গা গরম হয়ে আছে। সবুর ভাইয়ের বিরক্তি সেই উত্তাপে কোনো শীতলতা আনতে পারেনি। 

জুলহাজ গোসল থেকে বের হতেই পুরো ঘর মানুষ দিয়ে ভরে গেল। নানা রকমের মানুষ, নানা ধরনের মানুষ। কেউ কাছে আসতে চায়, কেউ নাগাল পেতে চায়। এরমধ্যে কে যেন ছুটে এসে উটপাখির পালক বসানো গাউনটা পরিয়ে দিলো, একজন পায়ের কাছে রাজ নাগাড়া নিয়ে অনেক্ষণ অপেক্ষা করছে। তাকে কোনো সুযোগ না দিয়েই টেবিল থেকে এপেলের প্যাডটা হাতে নিয়ে বিছানায় ধপ করে বসে পড়লো জুলহাজ। সেটা কি গাউনের ভার নাকি রাজকীয় কোনো ব্যাপার বুঝতে পারলাম না। একটু পর পর ট্যাবটা থেকে শব্দ আসছে ‘সুইট’ ‘সুইট’! ক্যান্ডি ক্রাশের অসহ্য শব্দে আমার মাথা ধরে যাচ্ছে। ওর চারপাশের ভিড়টা আরো বাড়ছে। সবাই চোখ-মুখ বড় করে মুগ্ধ হয়ে ওর ক্যান্ডি ক্র্যাশ খেলা দেখছে। কারো কারো মুখ হা হয়ে ভিতরের আলজিহ্বা দেখা যাচ্ছে, মুখ থেকে লালা গড়িয়ে পড়ছে। কেউ একজন এক কোনায় বসে ময়ূরপুচ্ছের পালক দিয়ে একমনে মুকুট তৈরি করছেl

-‘সুইট’!

জুলহাজের সেদিকে ভ্রূক্ষেপ নেই, ও একমনে ক্যান্ডি ক্রাশ খেলে যাচ্ছে। 

-‘সুইট’!

বিকট হাততালিতে পুরো ঘর গমগম করে উঠলো। 

-‘সুইট!’ 

হাততালি সাথে কারা কারা যেন অতি উৎসাহে শিষ বাঁজানো শুরু করলো। 

-‘সুইট’! 

একদল লোক এবার দাঁড়িয়ে গেল স্ট্যান্ডিং ওভেশন দিতে।

-‘সুইট’

-’সুইট’

-’সুইট’

আমি আর নিতে পারছি না। মাথা ব্যথা বাড়ছে এত সার্কাসের মাঝে। একটা লোক বাদশাহী গাউন পরে কোন রুচিতে ক্যান্ডি ক্র্যাশ খেলতে পারে তা মাথায় আসছে না। বাইরের মোম তখন শেষের দিকে, মাছগুলো ঐ দিশেহারা আলো-বাতাসের সাথে নিজেদের অনেকটা মানিয়ে নিয়েছে। আমিই কেবল মানাতে পারলাম না। বের হবার জন্য দরজার দিকে তাকাই। সে কি  আমার অভিমান নাকি ব্যর্থতা! 

টুটুল ভাই অসম্ভব সাহসী এক অধ্যায়ের নাম। উনি আমাদের ম্যাগাজিন ছাপাতে রাজি হলেন। নীতিগত কারনেই। মজার ব্যাপার হলো, এর মধ্যে আরেকজনকে খুঁজে বের করলাম যে টুটুল ভাইয়ের চাইতে কম টাকায় রূপবান ছাপাতে রাজি।একদম নাই ছাপাখানা থেকে দু-দুটো ছাপাখানা, জুলহাজ বেশ পুলকিত। রূপবানের সিএঞ্জি ভাড়া থেকে শুরু করে প্রেসের টাকা পর্যন্ত পুরোটাই আসতো জুলহাজের পকেট থেকে। প্রথম সংখ্যার পর অনেকেই রূপবান প্রকাশের জন্য টাকা দিতে চাইওলেও জুলহাজ অন্যের টাকায় রূপবান করতে আগ্রহী ছিল না। ওর একটাই কথা, প্রথম সাতটা সংখ্যার টাকা আমি দিবো।জুলহাজের এই নীতির সাথে আমার দ্বিমত থাকলেও একটা লোকের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা টাকা এভাবে তো চাইলেই আমি ওড়াতে পারি না। টাকার কথা মাথায় রেখেই টুটুল ভাইকে রূপবান না দিয়ে কম কোটেশনের দিকে ঝুঁকলাম। কিন্তু ভয় পিছু ছাড়লো না। যে ছাপাখানা রূপবান ছাপাতে রাজি হলো তার মালিক বাংলাদেশের খুবই প্রভাবশালী এক জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক। তারা সস্তায় ছাপাবে কিন্তু একটাই শর্ত, তাদের নাম কোথাও বলা যাবে না। এরপর আমি, জুলহাজ আর আমাদের তিন নাম্বার মাস্কিটিয়ার্সকে নিয়ে সেই বিখ্যাত সম্পাদকের বাসায় গোপন মিটিং করলাম। এর আগে তাকে শুধু টিভিতেই দেখেছি, সামনাসামনি কথা এই প্রথম। উনি কেন এরকম একটা রিস্কি প্রজেক্টে রাজি হলেন সেটা আজও আমার কাছে রহস্য। টাকার জন্য যে উনি রাজি হননি  তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। জুলহাজের মনেও অনেক দ্বিধা কিন্তু ততক্ষনে কথাবার্তা এতটাই এগিয়েছে যে আর পেছানো যাবে না।


সবুর ভাইয়ের প্রেস সেই নামকরা দৈনিকের ছাপাখানা। উনার অফিসটায় উঠতে গোল করে যে প্যাঁচানো টিনের সিঁড়ি, তারচেয়ে সরু আর লক্করঝক্কর সিঁড়ি আমি আমার জীবনে চড়িনি। উপরে উঠেই দিস্তা দিস্তা কাগজের ছড়াছড়ি আর কাঁচা  রঙের গন্ধ। একটা ফ্যানও চলছে না তাই গুমোট গরমে সবাই ঘামতে শুরু করেছি। এরমধ্যে সবুর ভাই আমাদেরকে চেয়ারে বসিয়ে হাওয়া হয়ে গেলেন। আমরা কেউ কোনো কথা বলছি না, গন্ধে নাকি উত্তেজনায় সবাই সবার দম খিঁচে আছি। টেবিলের উপর সবুর ভাইয়ের আধ-খাওয়া মুড়ি ভর্তার উপর একটা ঢ্যাপসা নীল মাছি ভনভন করছে। সবুর ভাই আবার অন্ধকার থেকে বের হয়ে এলো, এবার আর হাতে মুড়ি মাখা লেগে নেই। হাত ধুয়ে রূপবানের দুইটা কপি নিয়ে এসেছে। আমার দম একদম বন্ধ হয়ে গেল।


হঠাৎ দরজায় মুহুর্মূহ কিলের শব্দ । সব কোলাহল আর হাততালি মুহূর্তেই থেমে গেল। কেউ কেউ ভয়ে খাটের তলায় আর বাথরুমে পড়ে লুকোলো। জুলহাজ ঘরে থাকা বাকিদের দিকে তাকিয়ে একগাল হেসে বলল, 

-মনে হয় কুরিয়ার সার্ভিস। এত ভয় পাওয়ার কি আছে। আজ দুপুরেও একবার এসেছিল। আমাকে ভয় দেখাচ্ছে শুধু শুধু।


আমি আর জুলহাজ রূপবানের নতুন কপি হাতে নিয়ে বসে আছি। আমাদের সব উত্তেজনা এক মুহুর্তে উবে গেছে। যত পাতা উল্টাচ্ছি তত বিস্ময় অপেক্ষা করছে। আমি কাঁপা কাঁপা গলায় মুখ খুললাম-

-সবুর ভাই, রূপবানের লোগো তো এইবার নীল, এখানে তো শেড কালো হয়ে গেছে। আর এই ছবি দেখেন, এইটার উপর চারটা এক্সট্রা লেয়ারের শেড। ভিতরের লেখা দেখছেন, বেশিরভাগ কেঁপে গেছে, অনেক লেখা তো পড়াই যাচ্ছে না! এটা কি সর্বনাশ করছেন আপনি।

আমার সাথে পাক্কা নজরের জুলহাজ এবার তাল মেলালো। রং নিয়ে তর্কাতর্কি শুরু হয়ে গেল। জুলহাজ আর আমি জোর গলায় বলছি যে একটা রঙের শেডও ঠিক নেই। সব ভুলভাল রং। জুলহাজ বলল, 

-আপনি আরো কপি আনেন, আমরা দেখবো। 

সবুর ভাই নিম-মুখ করে ভিতরে চলে গেল।


জুলহাজ দরজা খুলতেই ধাক্কা দিয়ে ওর মা ভিতরে ঢুকে পড়লো!

-বাসাটারে কি পাইছোস মুমন! এইটা কি একটা ভদ্রলোকের বাসা নাকি বাজার! 

-আম্মা, কি হয়েছে? চিৎকার করছো কেন!

-আমি একটা বয়স্ক মহিলা, নামাজটাও ঠিক মত পড়তে পারি না। আমার সামনে দিয়া সারাক্ষণ অচেনা পোলাপাইন যাওয়া আসা করে। তুই বাসাডারে কি পাইছোস?

-অচেনা মানুষ তুমি আগে দেখো নাই আম্মা? তোমার স্বামী যখন মুক্তিযুদ্ধা করেছে, রাজনীতি করেছে, তখন কি বাসায় নতুন মানুষ আসতো না?

-মুমন, তুই আমার বাসায় এত মানুষ আনতে পারবি না।

-আচ্ছা, ঠিক আছে, আমিও তাহলে তোমার বাসায় থাকবো না। আমি নতুন বাসা খুঁজে নেব। এখন তুমি বের হও আমার রুম থেকে।

-কি? আমারে তুই আমার বাসা থেইকা বাইর কইরা দিবি?

-হ্যাঁ দিবো, অনেক নাটক হইছে, বের হও এখন। আমি দরজা লাগাবো।

সবুর ভাই টেবিলের উপর রাখা বাটি থেকে স্যামটা লাগা মুড়ি খেতে শুরু করেছে। আমি তার সামনে বসা, আমার দিকে না তাকিয়ে তিনি দূরে দরজার কাছে জমাট বাঁধা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে। টেবিলের উপর ছড়ানো ছিটানো রূপবানের কপি। ছয়শো কপির পুরো লট প্রিন্ট হয়ে গেছে।

-সবুর ভাই, আমাকে মাফ করেন। আমি এখান থেকে একটা রূপবানও নিতে পারবো না। আমি দুই মাস ধরে এটার ডিজাইন দেখছি, আমার পক্ষে এই ভুল জিনিস নেয়া সম্ভব না।

জুলহাজ এবার গলা মেলালো, 

-আপনি বলেন এটার সমাধান কি। আপনি নিজে বিচার করে বলেন।

সবুর ভাই একমনে স্যামটা লাগা মুড়ি মুখে পুরে যাচ্ছে। আমাদের দিকে না তাকিয়েই বলতে লাগলো,

-আপনারা চিন্তা কইরেন না। আমি পুরাটা আবার প্রিন্ট করবো। আপনাদের কোনো টাকা দেয়া লাগবে না। পুরাটা আমরা আবার করে দিবো। শুধু কাগজের খরচটা দিয়েন পারলে। আমার বিরাট লস হইবো কিন্তু আমি এটা করে দিবো। পরশু ঈদ, সবাই বাড়ি যাবে। আমারে মাইক্রো ভাড়া করে যেতে হবে। আমি কথা দিতেছি ঈদের এক সপ্তাহ পর আমি এই ম্যাগাজিন ছাপাইয়া দিমু। আপনারা বাসায় যান। এই ছয়শো কপি আমি কাটার দিয়া কাইটা ফালায়ে দিমু।


ঘরের দরজা লাগাতেই আবার শোরগোল শুরু হলো। একটা চেয়ার চলে এসেছে ততক্ষনে, ওকে টেনেটুনে ওখানে বসাতে চাইছে। আমার মাথা ব্যথায় তখন ছিঁড়ে যাচ্ছে। দরজার হাতলে হাত দিতেই আমার আমার চশমার কাকে ফেটে দু-টুকরো হয়ে গেলো। এরমধ্যে, অনেক শোরগোলের মধ্যেও জুলহাজের কান্নাটা ঠিক শুনতে পেলাম। গ্রিল কেটে চোর এসে নাকি মিরাকে চুরি করে ক্যাফেতে নিয়ে গেছে। নাকি মিরা নিজেই গ্রিল ভেংগে নিচে লাফ দিলো? এবার বিচ্ছেদের সময় হয়েছে বুঝতে পেরেই ঘাড়ের কামড়টা বুকে দাঁত বসালো। হঠাৎ দাঁড়িয়ে দরজা খুলে বের হয়ে গেলাম। পিছনে তাকিয়ে দেখি চোখমুখ মুছে ইমেইল লিখছে জুলহাজ,

-কখনো বুঝবে...এবং উপলব্ধি করবে...কতটা ভুল বুঝেছিলে তুমি...ভালোবাসার মর্যাদা করতে শেখো, সুখি হবে…

এইসমস্ত ঘটনার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আবার মাগরিবের আজান পড়ে যায়। অফিস থেকে নাখালপাড়ায় যেতে হয় না বলে সোজা বাসায় চলে আসে জুলহাজ। বাসায় ফিরে বক্সার আর সেন্টো গেঞ্জি গায়ে পরে ঘর পরিষ্কার করে, হয়তো গোসল সারে। এরপর মোম ধরাতে যাবে এমন সময় দরজায় কলিংবেল। মিরাকে আস্তে করে ঘর থেকে বের করে দরজা খুলতে যায় জুলহাজ। তারপর অনেক শোরগোল আর চীৎকার। শব্দ শুনে ওর মা ঘর থেকে বেরিয়ে আসে, মিরা ভয়ে ওর মায়ের ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দেয়। জুলহাজের মা আবার চিৎকার করতে থাকে,

-মুমন, তুই বাসায় আবার নতুন লোক আনছোস? বাসাটারে কি পাইছোস? এইটা কি মাছের মাজার?


এরপর মুমনকে আর কোথাও খুজেঁ পায়নি মিরারা।  

দুটি নক্ষত্রের সাথে সাক্ষাৎ

 

প্রায় বছর দুয়েক আগের কথা। শীতের এক দুপুরে বিছানায় শুয়ে আছি ফেসবুকে লগ-ইন করতেই বিবিসি বাংলার একটা নিউজে চোখ আটকে গেলো বাংলাদেশের প্রথম সমকামী বিষয়ক ম্যাগাজিন রূপবান-এর প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রকাশক জুলহাজ মান্নানের সাক্ষাৎকার আমি এর আগেও এই ম্যাগাজিনের নাম শুনেছিলাম তাই আগ্রহটা একটু বেশিই ছিল

সাক্ষাৎকার পড়ার পর এবার যথারীতি চোখ গেলো ফেসবুকের কমেন্ট বক্সে। হাজারো মানুষের মন্তব্যগুলো পড়তে শুরু করলাম নো! আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিনা! প্রায় প্রতিটা কমেন্টেই ছিল ঘৃণা, হুমকি, তাচ্ছিল্য, উপহাস, জঘন্য আর অপমানসূচক কথাবার্তা আমি স্বাভাবিকভাবেই ভয় পেয়ে যাই এসব মন্তব্যগুলো পড়ে সাথে সাথে ফেসবুকের একটা গ্রুপে নিউজটা শেয়ার করে ভয়ের কথা জানালাম এর কিছুক্ষণ পরেই দেখি একজন কমেন্ট করেছেন আমার শেয়ার দেয়া পোস্টে তিনি আর কেউ নন সেই সাক্ষাৎকারের কেন্দ্রীয় চরিত্র জুলহাজ মান্নান! আমাকে অভয় দিয়ে বলেছিলেন এগুলো খুবই স্বাভাবিক, এসবে ভয় না পেয়োনা আমার আশেপাশে এমন অভয় দেয়ার মানুষ খুবই কম ছিল তাই ভাবলাম ওনার সাথে পরিচিত হওয়া যায় ফেসবুকে ওনার সাথে যোগাযোগ হোল। মাঝে মাঝে কথা হতো কোনকিছু জানার থাকলে জিজ্ঞেস করতাম

কিছুদিন পর উনি আমাকে রুপবানের একটা ইভেন্টে অংশগ্রহণের জন্য বললেন।রুপবান ইয়ুথ লিডারশীপ প্রোগ্রাম ২০১৫ আমি সিদ্ধান্ত নিলাম অংশগ্রহণ করবো এতে ওনার সাথেও দেখাও হবে পাশাপাশি অনেক বন্ধুদের সাথেও পরিচিত হতে পারবো তাই আমি আর আমার এক বন্ধু দুজন মিলে ইভেন্টে অংশগ্রহণের জন্য ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম আরেক বন্ধু সে ঢাকাতেই ছিল সেও অংশগ্রহণ করবে বলে  সিদ্ধান্ত নেয় কিন্তু ঢাকাতে তো আমাদের থাকার কোন জায়গা নেই হোটেলে থাকলে অনেক টাকা খরচ হবে জুলহাজ মান্নানকে বিষয়টা বলায় উনি আমাদের থাকার ব্যবস্থা করে দেবেন বলে নিশ্চিত করলেন

ঢাকায় পৌঁছেই ওনাকে ফোন দিলাম উনি আমাদেরকে বললেন আমাদের পিক করার জন্য একজন ভদ্রলোক আসবেন ওই ভদ্রলোকটিই ছিলেন মাহবুব রাব্বি তনয় খোশগল্প করতে করতে একটু দূর থেকে তনয় একটা সিএনজি ডেকে আমাদের নিয়ে গেলেন জুলহাজ মান্নানের বাসায় বাসায় এসেই তনয় ফ্লোরে বসে পরলেন আর আমরা সোফায় আমাদের সাথে আরো কয়েকজন বসে আছে তারাও রূপবানের এই প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করতে এসেছে এর একটু পরেই জুলহাজ মান্নান আসলেন আমি অপরিচিত কাউকে সাধারণত স্যার বলে সম্বোধন করি ওনার সাথে যদিও এর আগে কথা হয়েছে কিন্তু তারপরও কেন জানিজুলহাজ ভাই’ বলে ডাকতে লজ্জা পাচ্ছিলাম হ্যালো স্যার বলে হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করলাম পাশে থেকে তনয় হেসে হেসে বললেন স্যার বলতে হবেনা, ভাই বলেই সম্বোধন করোআমি একটু মুচকি হেসে সায় দিলাম

সবাই মিলে ড্রয়িং রুমে আড্ডা দিচ্ছি কেউ গান গেয়ে শুনাচ্ছে, কেউ ডান্স পারফর্ম করেছে ইতোমধ্যেই অনেকগুলো মানুষের সাথে আমার পরিচয় হয়ে গেছে এর আগে আমি এলজিবিটি কমিউনিটির এত মানুষের সাথে মিশিনি তাই স্বাভাবিকভাবেই আমার অনেক ভালোলাগা কাজ করছিলো অনেক আড্ডা হলো এবার ডিনার করার পালা রাতের খাবারের জন্য সবাই বের হয়ে গেলাম পাশেই একটা রেস্টুরেন্টে ডিনার সেরে এলাম। তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তে হবে কারণ সকালে উঠেই প্রোগ্রামে এটেন্ড করবো

দুই দিনের এই অনুষ্ঠানে আমার অনেক মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে প্রথমদিনের প্রোগ্রাম শেষ করে সবাই চলে গেলাম শাহবাগ বইমেলাতে সেখানে রূপবানের কবিতার বই রুপংক্তি মোড়ক উন্মোচন হবে আমি শুদ্ধস্বর স্টল থেকে রুপংক্তি একটা বই কিনে নিলাম দ্বিতীয় দিনের প্রোগ্রাম শেষে সার্টিফিকেট গিভিং সিরিমনিতে অংশগ্রহনের জন্য সবাইকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে প্রোগ্রামের সমাপ্তি ঘোষনা করেন জুলহাজ মান্নান তারপর ফেসবুকেই মুলত জুলহাজ মান্নান, তনয় মাহবুবসহ অন্য সবার সাথে যোগাযোগ হতো আমি নির্ভয়ে জুলহাজ ভাইয়ের সাথে আমার বিভিন্ন বিষয় শেয়ার করতাম উনি আমার কথাগুলো শুনতেন আর উৎসাহ দিতেন

এর কয়েকমাস পরেই জুলহাজ ভাই, তনয় মাহবুব আরো অনেকেই আমাদের ক্যাম্পাস ঘুরতে আসেন ফেসবুকে আমাদের জানিয়ে দিলেন যে তারা আসছেন তাদের নিয়ে ক্যাম্পাসে আমরা কয়েকজন বন্ধু আড্ডা দিলাম, ক্যাম্পাসের আড্ডা শেষে ওনারা যে হোটেলে উঠেছেন সেখানে আমরা গেলাম সেখানে রুপংক্তি পাঠের আসর বসানো হয় সবাই একটা করে কবিতা পাঠ করি, গান গাই আর ফাজলামি করি পানসি রেস্টুরেন্টে রাতের খাবার খেয়ে আমরা তাদের বিদায় দিয়ে চলে এসেছিলাম কিন্তু এটাই যে জুলহাজ ভাই তনয় ভাইয়ের সাথে আমাদের শেষ দেখা হবে সেটা কখনও ভাবিনি

২০১৬ সালের রেইনবো ্যালিতে যাবো বলে আমরা বন্ধুরা মিলে প্ল্যান করি কিন্তু শেষে শুনি কিছু উগ্র মৌলবাদীদের হুমকির মুখে ্যালীর পরিকল্পনা বাতিল করা হয়েছে মনটা তখন ভীষণ খারাপ হয়ে যায় আমরা আমাদের উদ্বেগের কথা জুলহাজ ভাইকে জানাই এবং তাকে তার সহকর্মী বন্ধুদের নিরাপদ থাকার পরামর্শ দেই এর কিছুদিন পর ২৫শে এপ্রিল সন্ধ্যায় আমি আর আমার বন্ধু ক্যাম্পাসে বসে আড্ডা দিচ্ছিলাম হঠাৎ করে আমার বন্ধু বলে উঠলোঃ আমাদের সব শেষ! সবকিছু শেষ হয়ে গেছে! আমি উদ্বিগ্ন হয়ে বললাম কি হয়েছে? এমন করছিস কেন? বলল জুলহাজ ভাই আর তনয় ভাই আর নেই! এটা শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে যাই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না আসলেই কি সত্যি বলছে না মিথ্যাতখন কি করবো বুঝতে পারছিলাম না

এখন আমাদের আর আগের মত আড্ডা দেওয়া হয়না কারণ যখনই আমরা একসাথে হতাম ওদের স্মৃতি মনে পড়তো কিন্তু এটাই যে সত্যি, জুলহাজ ভাই আর তনয় ভাই নেই তখন নিজেরা নিজেদের সান্ত্বনা দিতাম নিজের আপন জনের কাছে আমি আমার যে কথাগুলো বলতে পারতাম না সেটা ওদের কাছে বলতামতাই অল্প কিছুদিনের পরিচয়েই আমি তাদেরকে আপন করে নিয়েছিলাম জুলহাজ ভাই তনয় ভাই, আমি তোমাদের কাছে কৃতজ্ঞ, যেখানেই থাকো আমার ভালোবাসা নিয়ো

সময়টা ২০০৭। প্রায় নয় বছর। কিন্তু এখনো দিন গুলো খুব কাছের মনে হয়। মনের ক্যানভাসে আঁকা রঙিন স্মৃতি গুলো এত দিনেও ফ্যাকাসে হয়ে যায় নাই। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় সেই মানুষটা এখন আর নেই। মনে হয় এই তো সেই মানুষ টা কে এখন ফোন করলেই তার কণ্ঠ শোনা যাবে।কোন পার্টি ,পিকনিক অথবা ট্যুরের কথা বলবে। যাওয়ার জন্য জোরাজুরি করবে। আমি অনেক দুর্ভাগা কারন বহুবার তিনি আমাকে তার সাথে ট্যুরে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু আমি যাই নাই। এক অজানা অভিমানে আমি দূরে সরে গিয়েছিলাম। গুটিয়ে নিয়েছিলাম আমাকে তার কাছ থেকে। তখনো জুলহাজ ভাই সেলেব্রিটি হন নাই। কিন্তু তাই বলে তিনি পরিচিত ছিলেন না তা নয়। আমার সাথে তার পরিচয় হয়েছিল এক ডিসেম্বরে। মনে আছে একটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার প্রোফাইল দেখে আমিই নক করেছিলাম। আমি তখন এই কমিউনিটি তে নতুন। সম্ভবত তার আইডি টি ছিল ব্লপ্রিন্স।কিন্তু অদ্ভুদ ছবি আপলোড করে তিনি চলে গিয়েছিলেন কলকাতা।এই ছবি দেখেই তার দরজায় কড়া নেমেছিলেম আমি।বন্ধুত্বের আহবান জানিয়েছিলাম। তিনি কলকাতা থেকে ফিরে এসে আমার মেসেজের উত্তর দিলেন। ইয়াহু আইডি এক্সচেঞ্জ করলাম। প্রচুর চ্যাট হত। কারন তখন আমি ফ্রি থাকতাম। আর জুলহাজ ভাইয়া তখন ফ্রি ল্যান্সর হিসেবে কাজ করতেন। সাধারণত রাতে চ্যাট হত।শীতের রাতে চাঁদর পেঁচিয়ে ডেস্ক টপে বসে চ্যাট করতাম।ভুলবো না সেই রাত গুলোর কথা।নানা বিষয় নিয়ে চ্যাট হত। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে ফ্যাশন, প্রকৃতি প্রেম।যতই দিন যেতে লাগলো জুলহাজ ভাইয়া আমার পছন্দের মানুষ হয়ে উঠলেন। জানি না আমি তার কতটুকু পছন্দের মানুষ হয়েছিলেম।তখনো আমার তার সাথে দেখা হয় নাই।এই সময় মজার একটা ঘটনা ঘটেছিল। জুলহাজ ভাইয়া সন্দেহ করছিলেন আমি তার পরিচিত একজন বন্ধু ।তাকে বোকা বানানোর জন্য ফেক আইডি দিয়ে চ্যাট করছি। পরে আমার বেশ কয়েকটা ছবি দেয়ার পর তিনি বিশ্বাস করলেন। একদিন জানলাম জুলহাজ ভাইয়া আমেরিকান দূতাবাসে চাকুরী পেয়েছেন।সেই উপলক্ষে তিনি একটা পার্টি দিলেন সান্টুর রেস্টুরেন্টে। আমাকেও দাওয়াত দিলেন। আমি এর আগে কক্ষনোই কোন পার্টি তে যাই নাই। এতজন নতুন মানুষের সাথে আমার দেখা হবে। সর্বোপরি জুলহাজ ভাইয়ের সাথে দেখা হবে। এতদিনের অপেক্ষা আমার। দুরু দুরু বুকে পার্টি তে উপস্থিত হলাম। যা ভাবতাম জুলহাজ ভাইয়া কে। তিনি সামনাসামনি ঠিক তেমনি। হাসি খুশি, প্রাণ চঞ্চল ।আমার এখনো মনে আছে জুলহাজ ভাই একটি চমৎকার একটি ফুলহাতা সিল্ক এর শার্ট পরেছিলেন।চুল লম্বা। সর্বদা হাসি মুখ। এই তো একজনের সাথে নাচছেন তো। আবার ধরে নিয়ে আসলেন আরেকজন কে ড্যান্স ফ্লোরে নাচার জন্য। আমাকেও দুই একবার চেষ্টা করলেন নাচানোর জন্য। কিন্তু আমি খুবই লাজুক ছিলাম তখন। তার উপর কাউকেই চিনি না। তার এই উৎসাহ পুরাই বিফলে গেলো। আমি নাচলাম না। কিন্তু ভাল লাগার এক অনুভূতি নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। দ্বিতীয় বার দেখা হল পরেরদিনই টি এস সি তে।জুলহাজ ভাই ছিলেন সারকাসম এর রাজা। কেউ তার সারকাসম থেকে রক্ষা পেতো না। আমিও না। ধীরে ধীরে জুলহাজ ভাইয়ের ফ্রেন্ড সার্কেলে পরিচিত হয়ে উঠলাম।জুলহাজ ভাইয়ার সাথে যাই বিভিন্ন আড্ডা , পার্টি তে। জুলহাজ ভাই আমার খুব কাছের মানুষ হয়ে উঠলেন। একদিন ধানমন্ডি লেকে বসে জুলহাজ ভাই আমাকে বললেন তার স্কুল জীবন , কলেজ জীবন আর ভার্সিটি জীবনের কথা। আমি খুব আবেগপ্রবণ হয়ে উঠেছিলাম সেদিন। আমি নিজেকে খুলে দিয়েছিলাম খোলা বইয়ের মত। বলেছিলাম আমার নিজের জীবনের কথা। জুলহাজ ভাই আসলে এমন মানুষ যাকে ভরসা করে সব কথা বলেছিলাম। জুলহাজ ভাই আমাকে অনেক উপদেশ দিতেন কিভাবে নিজেকে আরও সুন্দর ভাবে প্রেজেন্ট করা যায়।তাকে দেখেই আমি বুঝেছি কিভাবে জীবনটা কে সহজ ভাবে নেয়া যায়। মনে আছে বর্ষার প্রথম দিনে আমরা সবাই বের হয়ে ছিলাম চারুকলায় (জুলহাজ ভাই আর তার বন্ধু সার্কেল)। ইফতার পার্টি , জুলহাজ ভাইয়ার জন্মদিন,ডিজে পার্টি আরও ছোট ছোট আড্ডা তো অনেক রয়েছেই।সবই মনের পর্দায় একে একে আসছে।পরীক্ষার আগের দিনও আমাকে তিনি বাসা থেকে টেনে নামালেন। বললেন ১ ঘণ্টার জন্য কিছু হবে না। বরং মাথা ঠাণ্ডা হবে। এক বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যার কথা মনে পড়ে আমার। বসুন্ধরা সিটি তে আড্ডা দিয়ে বের হলাম জুলহাজ ভাইয়ার সাথে। বাইরে টিপ টিপ বৃষ্টি । রাস্তার উলটা দিকে গ্রিন রোডের মোড় থেকে রিক্সা নিবো। আমাকে নামিয়ে দিয়ে জুলহাজ ভাই শ্যামলি চলে যাবেন। রিক্সা উঠতেই ঝুম বৃষ্টি। বৃষ্টি তো আমার অসম্ভব প্রিয়।কেন জানি লিখতে গিয়ে এই সন্ধ্যার কথা মনে পড়ছে। আমার বাসা পর্যন্ত আসতে আসতে আমরা অনেকখানি ভিজেই গেলাম।পুরো রিক্সা তে গল্প করতে করতে আসলাম।কোন উল্লেখ যোগ্য ঘটনা হয়তো না। কিন্তু কেন জানি তারপরও মনে পড়ছে।তাই লিখলাম। আসলে অনেক সামান্য ঘটনাই কখনো কখনো অসামান্য হয়ে যায়। জুলহাজ ভাইয়ার জীবনে গানের একটা অসামান্য অবদান আছে।জুলহাজ ভাইয়া কে খুব একটা বই পড়ার কথা বলতে শুনতাম না। সিনেমা দেখতে খুব ভালবাসতেন তাও নয়।কিন্তু গান ছিল তার জীবনের প্রাণ। আমি যখন তার সাথে মিশতাম তখন তার প্রিয় সঙ্গীত শিল্পী দের যাদের নাম মনে পড়ছে তারা হলেন সায়ান, কৃষ্ণকলি। জুলহাজ ভাইয়ের আরেকটা খুব বড় পছন্দের ব্যাপার ছিল প্রকৃতি। প্রকৃতি প্রেমিক ছিলেন তিনি। ভ্রমণ করতে অসম্ভব পছন্দ করতেন। তার সাথে আড্ডা দেয়ার একটা কমন প্লেস ছিল ধানমণ্ডি ৩২।এছাড়া বেশ কিছু রেস্টুরেন্ট, বসুন্ধরা সিটি তে বসা হত। আমার সাথে সব সময় ধানমন্ডির আশেপাশেই দেখা হত। একবার পিজ্জা খেতে গেলাম দি পেভমেন্টে। স্বাদ তেহারি ঘর, নানদোস, হটহাট, বুমারসে বসা হত। আসলে তখন ধানমণ্ডি এলাকায় এত রেস্টুরেন্ট ছিল না। ঢাকা ভার্সিটি এলাকা, টি এস সি ভুলে গেলাম কিভাবে। ওখানেও প্রায় যাওয়া হত। এছাড়া রবীন্দ্র সরবোর , আজিজ সুপার মার্কেট ছিল আমাদের রেগুলার হ্যাং আউট প্লেস। জুলহাজ ভাইয়ের সাথে পরিচয় এর পরের আমার প্রথম জন্মদিন তিনি ভুলে গিয়েছিলেন। আমি বলেছিলাম আমার জন্মদিনে তাকে ট্রিট দিবো ।কিন্তু ভুলে গেলেন। আমার কিছুটা রাগ হয়েছিল।কিন্তু ভুলে যাওয়া স্বাভাবিক। তখন ফেসবুক ছিল না।আমি তাকে এই কথা বলার পর তিনি খুব কষ্ট পেলেন । কিন্তু নিজের পক্ষে সাফাই গাইলেন না। বরং সরি বললেন।আমিও মেনে নিলাম। মজার ব্যাপার ঘটলো পরের জন্মদিনে। তখন জুলহাজ ভাইয়ার সাথে একটা বিশেষ কারনে আমার দূরত্ব তৈরি হয়েছে। তারপরও তিনি উইশ করে মেসেজ পাঠালেন ।নিচে লিখেছিলেন যে তিনি এক বছর আগে থেকেই আমার জন্মদিনের জন্য অনেক পরিকল্পনা করেছিলেন আমাকে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য। কিন্তু এখন হয়তো আমি আর তা পছন্দ করবো না।তাই সেগুলো আর করা হল না।এখনো আমার জানতে ইচ্ছা করে কি ছিল সেই সারপ্রাইজ গুলো ।কিন্তু তা জানা তো আর সম্ভব নয়। জুলহাজ ভাইয়ার সাথে শেষ যে পার্টি তে গিয়েছিলাম তা হল নিউ ইয়ার পার্টি। জুলহাজ ভাইয়া, আমি এবং আরও ২ জন ভাইয়া ছিলেন। আমরা গিয়েছিলাম হোটেল শেরাটনের নিউ ইয়ার পার্টি তে।সবার সাথে আমিও নেচেছিলেম অনেক। অনেক উপভোগ করেছিলাম পার্টি । কিন্তু ঐদিনের পর আর সেভাবে মেশা হয় নাই উনার সাথে। একটা অভিমানের কারনে আমি তার থেকে দূরে সরে গিয়েছিলাম। আর সাল টা ছিল ২০০৯। এর পর অনেক বছর কেটে গিয়েছে। আমি তাঁর সব খবরই রাখতাম। কিন্তু যোগাযোগ করা হয়ে উঠে নাই।মাঝে মাঝে তিনি যোগাযোগ করেছেন। কিন্তু আমি উপেক্ষা করেছি। স্বভাবতই এক সময় থেমে গিয়েছেন তিনি।এরপর আমার তার সাথে দেখা হয়েছে হাতে গুনে ৫ বার বিভিন্ন সময় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। তার সাথে শেষ দেখা আমার এক বন্ধুর জন্মদিনে।সেখানে ইফতার পার্টির আয়োজন করা হয়েছিল । কারন তখন রমজান মাস।আমি তার হাত ইফতারের প্লেট ধরিয়ে বলেছিলাম কেমন আছেন। এই আমার শেষ কথা তার সাথে। জীবন খুব অদ্ভুত। যা চলে যায় তার জন্য আফসোসের শেষ থাকে না।জুলহাজ ভাইয়ার মত মানুষের বন্ধু হতে পারাটা অনেক বড় ব্যাপার। এখন মনে হয় কেন সকল অভিমান দূর করে কেন আগের মত তার বন্ধু হই নাই।এখন তো চাইলেও তা পারবো না। জানি না সেই অজানা জগতে তিনি কেমন আছেন। কিন্তু আমার ভালবাসা , দুয়া সবসময় তার জন্য থাকবে।

সংগ্রাম

পরিচয় হয়েছিল বছর হবে কিন্তু মনের মিলের কারণে সবসময় মনে হয়েছে দুজন দুজনকে চিনি বহু বছর। এটা ওনার একটা অসাধারণ গুণ ছিল। উনি নতুন কাউকে এমনভাবে বরণ করে নিতেন যেন মনে হত অনেক দিনের পরিচয় জুলহাজ ভাইয়ের সাথে আমার অনেক ছোট-বড় স্মৃতি থাকলেও ২০১৬ সালের ১৪ই এপ্রিল আমার মনে থাকবে যতদিন বাঁচবো উনার মৃত্যুর মাত্র ১১ দিন আগে ঘটে যাওয়া ঐ ঘটনা আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে অকল্পনীয়ভাবে। সেদিন জুলহাজ ভাইয়া আর তনয় ভাইয়া হন্য হয়ে যেভাবে আমাকে বিপদ থেকে রক্ষার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছে তার জন্য আমি চির কৃতজ্ঞ। অন্য কেউ হলে হয়ত আমাকে ফেলে রেখে ফোন বন্ধ করে নিজ নিজ নববর্ষ উদযাপনে ব্যস্ত থাকত তো ঘটনাটা একটু খুলে বলি

১৩ই এপ্রিল ২০১৬ সকাল থেকেই আমরা সবাই জুলহাজ ভাইয়ার বাসায় যেটাকে আমরা নানুবাড়ী বলতাম সেখানে আজকে শেষ দিন এতদিনের প্রস্তুতির আজকে সমাপ্তি ওইদিন ব্যক্তিগত কিছু কারনে আমার মন খারাপ ছিল জুলহাজ ভাইয়াও মনে হয় তা বুঝতে পেরেছিলেন তাই ছোটখাটো জোকস করে হাসানোর চেষ্টা করছিলেন দুপুরের দিকে এত দিনের বানানো রঙ্গিন কাগজের ফুল, ঝুড়ি, মুকুট নিয়ে আমরা রওনা দিলাম চারুকলা এর উদ্দেশ্যে জনের জন্য ৩টি রিকশা নেওয়া হোল আমি আর জুলহাজ ভাইয়া একই রিকশায় কিছুক্ষণ আমরা কসরত করলাম কিভাবে এত কিছু ম্যানেজ করে রিকশায় বসব। শেষে কোনভাবে বসা হলেও দম বন্ধ হয়ে আসছিল দুজনেরই এতো রংবেরঙের বাহারি জিনিষ একসাথে রিকশায় দেখে রাস্তার বাচ্চাকাচ্চারা রিকশার পিছনে ছুট। কাছে যারা ছিল তারা তো রীতিমত কাগজের ফুলের সুতো ধরে টানাটানি করছিল উনি হাল্কা ধমকের সুরে বললেনএমন করছ কেন, জীবনে দেখনি?” পরে আমার দিকে তাকিয়ে বললেনআমিও কি গাধা, এদের জীবনই বা হইসে কতটুকু যে কিসু দেখবে?” জানিনা কেন কিন্তু এটা শুনে আমি ১০ মিনিট হাসি থামাতে পারিনি কিছুক্ষণ পর হুট করে উনি খুবই সিরিয়াস হয়ে গেলেন এবং জিজ্ঞেস করলেনআপনার কি মনে হয়, কালকে র‍্যালিতে ওদের কারণে কোন ঝামেলা হবে?” এখানে বলে রাখি ওরা কারা

রংধনু র‍্যালী ২০১৪ ২০১৫ সালেও হয়েছিল কিন্তু তখন রংধনু থেকে ছয়টি রং নিয়ে তৈরি করা সমকামীদের প্রতীকের মর্মার্থ মানুষ কমই বুঝতো ২০১৫ সালে যখন আমেরিকায় সমকামী বিয়ে বৈধ করা হয় ফেইসবুকে রেইনবো ফিল্টার চালু হয়, তখন রংধনু জিনিসটা কি তা সাধারণের মস্তিষ্কে ঢুকলো এরপর রূপবান যখন ২০১৬ সালের র‍্যালীর জন্য ফেইসবুকে ইভেন্ট তৈরি করে সেটা ভাইরাল হয়ে যায় এবং সেটাকে বিরোধীতা করে আরেকটা ইভেন্ট তৈরি হয়। রূপবানের কয়েকজন সদস্যের ছবি ও ফেইসবুক প্রোফাইল শেয়ার করা হয়েছিল গ্রুপে সাথে প্রাণ নাশের হুমকি তাদের মধ্যে কোনভাবে আমার ছবিও চলে আসে তারপর শুরু হোল হুমকি আর গালির বন্যা। এমন কোন ধরণের হুমকি নেই যা পোষ্ট করা হয়নি শাহবাগের চত্বরেই কোপানো হবে এটা ছিল কমন একটা থ্রেট গত বছর এই সময় উৎসব উৎসব ভাব থাকলেও এবার আমাদের সবার মনে ছিল ভয় সবার মনে কেমন জানি একটা দুশ্চিন্তা, “কোন অঘটন যদি ঘটে যায়?”

তো জুলহাজ ভাইয়ের প্রশ্নের উত্তরে আমি বললাম, “কাল কি হয় এটা তো বলা যায়না ফেইসবুকে কত জনে কত কিছু বলে তেমন কিছু তো হতে দেখিনি বিপদ তো এই দেশে রাস্তায় চলতে গেলেও বিদ্যমানউনি কোন রেসপন্স করলেন না আনমনে কি যেন ভাবছিলেন চারুকলায় আমাদের বানানো জিনিসপাতি রেখে বেশ কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে শেষে ভাইয়ার বাসায় চলে আসলাম সেদিন আমরা যখন রাস্তায় তখন ভুমিকম্প হয়েছিলো। স্বাভাবিকভাবে মানুষের ঢল নেমে এসেছিল রাস্তায় তাই আমাদের বাসায় ফিরতেও দেরি হয়েছিলো নানুর বাসাতেই থাকবো প্ল্যান তাই কোন তাড়াহুড়ো ছিল না হুট করে মনে পড়লো যে আমার একটি জিনিস পৌঁছে দিতে হবে আমার বোনের কাছে যার বাসা ভাইয়ার বাসা থেকে মিনিট এর দুরত্ব আমি সেই কাজ সেরে যখন ফেরত আসলাম তখন দেখি সবার চোখেমুখে কেমন এক হতাশা এমন অবস্থা যে ভয়ে কাউকে জিজ্ঞেসও করতে পারছিলাম না কি হয়েছে কিছুক্ষণ পরে জানলাম। বর্তমান অবস্থার প্রেক্ষিতে র‍্যালী বাতিল করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। কিন্তু সেখানে অংশগ্রহণ করার জন্য ইতিমধ্যে ৩০০-এর মত মানুষ নিশ্চিত করেছে এই মাঝরাতে এত মানুষকে কল করে জানানো সম্ভব নয়। শেষে এই সিদ্ধান্তে আসা হোল যে, যেখানে সবার দেখা করার পরিকল্পনা ছিল সেখানে গিয়ে জানিয়ে দেওয়া হবে যে র‍্যালী হচ্ছে না মনে অনেক কষ্ট দেশের আইনের উপর ক্ষোভ নিয়ে সবাই ঘুমিয়ে পরলাম তারপরেও জুলহাজ, তনয় আরেকজন ভাইয়া যেন অন্য কোন কিছু নিয়ে চিন্তিত

সকালে সবাই রেডি হয়ে একেক জন একেক রঙের পাঞ্জাবী পড়ে রওনা দিলাম শাহাবাগের উদ্দেশ্যে। সেখানে আগত বন্ধুদের জানিয়ে দেওয়া হল যে নিরাপত্তার কথা ভেবে র‍্যালী হচ্ছেনা সবারই মন খারাপ হয়েছিল কিন্তু পরিস্থিতি বিবেচনা করে কেউ কোন কথা বলল না কিন্তু কিছু বন্ধু জুলহাজ ভাইয়ের কাছে আবদার করলো যে আমাদের বানানো কাগজের সামগ্রীগুলো তারা ব্যবহার করবে। ভাইয়ার বারণ করা সত্ত্বেও তারা কিছু কিছু সামগ্রী নিল এই আশ্বাস দিয়ে যে কিছুই হবেনা

যথারীতি সময়ে চারুকলা থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু হল আমরাও যোগদান করলাম পূর্বের রাতের বিগত বছরের গ্লানি ভুলে গিয়ে আনন্দ বুকে নিয়ে কিন্তু সবার বুকে একই আনন্দ ছিল না আমি বেশ পিছনে ছিলাম কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে খেয়াল করলাম জুলহাজ ভাইয়ার কালো চশমা থেকে গালবেঁয়ে পানি মাথা হুট করে কাজ করা বন্ধ করে দিল ভাইয়াকে কখনো এমনভাবে কান্না করতে দেখিনি আর মানুষ কান্না করলে কি করে কি বলে সান্ত্বনা দিতে হয় এই ব্যপারে আমি খুবই অজ্ঞ দেখলাম আমাদের এক মেয়ে বন্ধু সেটা খেয়াল করেছে এবং সাথে সাথে ভাইয়ার হাত ধরে নিয়ে গেল গান-বাজ্না-নাচে জমজমাট র‍্যালীর অংশে।

শোভাযাত্রা শেষ হোল সবাই যার যার মত এদিক সেদিক ছড়িয়ে পড়লো এদিকে আমার প্ল্যান ছিল আবার জুলহাজ ভাইয়ার বাসায় গিয়ে আমার ব্যাগ নিয়ে নিজের বাসায় গিয়ে ঘুমানো চারুকলার দিকে হাঁটা শুরু করলাম এই আশায় যে কাউকে হয়ত পেয়ে যাব আর আড্ডা দিতে দিতে লম্বা পথ পাড়ি দেওয়া যাবে কারন নববর্ষের দিনে রিকশা পাওয়ার থেকে লটারি জেতা সহজ সেখানে গিয়ে দেখলাম কিছু নতুন ছেলে, যারা বছরের রূপবান ইউথ লিডারশীপ ট্রেনিং-এ যোগ দিয়েছিল তখন তেমন কথা হয়নি তাই পরিচয় বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেলাম আমরা কথা বলছি এমন সময় এক টিভি চ্যানেলের সংবাদকর্মী এগিয়ে এলো ইন্টারভিউ নেবার জন্য আমি দূরে চলে গেলাম কারণ এমন হুট করে কিছু বলতে আমি পারিনা আরেকজন এলো আমার সাথে একই কারণে ওদের কথা শেষ হলে আমরা বাংলা একাডেমীর দিকে পা বাড়ালাম। আমি ভাবছিলাম টিএসসি থেকে অন্য পথে চলে যাব কারন ক্লান্ত লাগছিল

কাজী নজরুল ইসলাম-এর সমাধি আর মসজিদ পার করে যাত্রী ছাউনির দিকে যাবার সময় হুট করে পুলিশ ডাক দিল ভাবলাম অন্য কাউকে ডাকছে তাই থামলাম না প্রথমে। কিন্তু আমার সাথের অন্যরা থেমে গেলে বুঝলাম আমাদেরকেই ডাকছিল এগিয়ে গেলেই পুলিশ বডিসার্চ করা শুরু করল কারো কাছেই কিছু পেল না একজনের হাতে একটা রঙ্গিন কাগজে মোড়ানো গিফট বক্স ছিল তন্ন তন্ন করে সেটাও তল্লাশি করল। কিছু না পাওয়ার পরেও যখন ছাড়ছে না তখন বুঝলাম সামনে বড় বিপদ আছে। সাথে সাথে ফোন বের করে প্রথমেই আম্মু এবং আব্বুর নাম্বার মুছে ফেললাম এবং জুলহাজ ভাইয়ার নাম্বারআব্বুনামে সেভ করলাম পুলিশ বলল কিছু ব্যপারে উনার ওসি সাহেব আমাদের সাথে কথা বলতে চান কথা বলেই ছেড়ে দিবে আমাদের জনকে নিয়ে গেল শাহবাগ থানায় যখন নিয়ে যাচ্ছিল তখন কোনমতে জুলহাজ ভাইয়াকে একটি ম্যাসেজ দিতে পেরেছিলাম কি হয়েছে এটা বলে উনি সাথে সাথে রিপ্লাই দিলেন যে উনি আসছেন।

ওসি’র কাছে যাওয়ার পর বুঝতে পারলাম ঘটনা আমাদের বন্ধুরা যারা ওই সংবাদকর্মীর কাছে ইন্টার্ভিউ দিয়েছিল তারা কোন এক ফাঁকে সমকামীদের অধিকার নিয়ে কথা বলেছিল। এখন ঐ সংবাদকর্মী সেটা পুলিশকে জানিয়েছিল নাকি পাশে থাকা কোন পুলিশ শুনে টার্গেট করেছিল তা বুঝিনি ওসি আমাদের সবার ফোন নিয়ে নিল। এ পর্যায়ে কয়েকজন ভয় পেয়ে পুলিশের সাথে তর্ক করা শুরু করে পুলিশকে আরও রাগিয়ে দেয়। দুই পক্ষের তর্কাতর্কির সুযোগে আমি পুলিশের ড্রয়ার খুলে নিজের ফোন নিয়ে নিলাম এরপর বিরক্ত হয়ে ওসি আমাদের লকআপ- রাখার আদেশ দিল পুলিশের কক্ষ থেকে বের হয়েই দেখি জুলহাজ ভাইয়া যেতে যেতে তাকে যতটুকু বলা যায় বললাম আমার ফোনটি তার হাতে দিলাম বুঝতে পারলাম জুলহাজ ভাইয়া অনেক আপসেট কারাগারে ঢুকাল আমাদের কিন্তু যেন বন্দি হয়ে গেলেন জুলহাজ ভাইয়া

সকাল ১১টায় শুরু হয়ে পুলিশী হেনস্তা চলল পুরো ১৪ ঘণ্টা এই দীর্ঘ সময়ে এক মুহুর্তের জন্যও জুলহাজ তনয় ভাইয়াকে দৃষ্টির বাইরে দেখিনি কিছুক্ষণ পর পর একজন এসে সাহস দিয়ে যাচ্ছিল এবং ওদিকে তারা সর্বাত্মক চেষ্টা করছিল আমাদের তাড়াতাড়ি বের করতে। আমাদেরকে আবার ডাকা হলো যত উপায়ে সম্ভব অপমান করা হল পুলিশ নির্দেশ দিল মা-বাবা কে আসতে হবে অসহায় হয়ে করুণ দৃষ্টিতে জুলহাজ ভাইয়ার দিকে তাকালাম আশ্বাস দিল কিছু হবেনা এই আশ্বাসেই বিশ্বাস পেলাম নাম্বার বললাম পুলিশকে পুলিশ কল দিয়ে যা তা বলে মা-বাবা কে ভয় দেখিয়ে থানায় আসতে বলল জীবনে এতো অপমানিত কখনো হইনি ৩০ মিনিট পর মা যখন এলো খুবই লজ্জিত লাগছিল পুলিশ তাকেও অপমান করার সকল চেষ্টা করল কিন্তু মা মাথা ঠাণ্ডা রাখল মা কথা শুনে মনে হল উনি আসল ঘটনা সম্পর্কে অবগত কীভাবে জানল তা বুঝে উঠতে পারলাম না

সকল ফর্মালিটি সম্পূর্ণ করে থানা থেকে বের হয়েই ভাইয়াকে জড়িয়ে ধরলাম উনার আপ্রাণ চেষ্টার কারণে এত বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছি তখন বুঝতে পেরেছিলাম কীভাবে আমার মা আসল ঘটনা জানতে পেরেছে। পুলিশকে নাম্বার বলার সময় ভাইয়া নাম্বার টুকে নিয়ে আমার বাসায় কল করে সান্ত্বনা দিয়ে আসল ঘটনা জানিয়েছিল আমার আব্বু-আম্মু বার বার বলছিল তারা জুলহাজ, তনয় আরেকজন ভাইয়ার কাছে চির ঋণী আমি বের হওয়ার পর জুলহাজ ভাইয়া, তনয় ভাইয়া অন্য ভাইয়াটি আবার থানায় গেলেন কারণ তখনও ২ জনকে আটক ছিল।

এই ঘটনা থেকে মুক্তি দিয়েই ভাইয়া থেমে যাননি পরের দিন থেকেই সকল প্রকার সাহায্য দিয়েছিল যেন এই ট্রমা থেকে মুক্তি পাই একদিন যেতে বলল ফটোগ্রাফি নিয়ে কিছু কাজ হবে সেটা দেখতে আড্ডা দিতে সেদিন ক্লাস শেষে যখন যাচ্ছিলাম ওনার বাসায় তখন এক বন্ধুর ফোন এলো শুনলাম আমার জীবনের সবচেয়ে নির্মম সত্য। জুলহাজ আর তনয় ভাইয়াকে মেরে ফেলা হয়েছে পৃথিবী তখনই কেমন জানি থমকে গেল 

আজকে এক বছর হতে চলল এর মধ্যে অনেক পরিবর্তন এলো জীবনে কিন্তু এমন কোন দিন যায়নি যেদিন তাদের কথা মনে পড়েনি জানি তারা আজও আছেন অবশেষে শান্তিতে

কিছু মানুষ নিজ প্রয়োজনে সংগ্রাম করে তো কিছু মানুষ সহজ জীবন উপায় ত্যাগ করে সংগ্রাম করে চলে সৎ সত্যের জন্য জুলহাজ তনয় ভাইয়া ছিল সত্যকে সবার সামনে তুলে ধরার মত মানুষ দুজনের চরিত্রে কিছু মিল একটু বেশি অমিল থাকলেও একসাথে অসাধারণ সব idea বানাত তাদের সাথে থেকে আমি যে জ্ঞান দক্ষতা অর্জন করেছি তা অন্য কোন মাধ্যমে পেতাম কি না ভাবতেও পারিনা
বিশেষ করে জুলহাজ ভাইয়া, তার মাধ্যমেই শিখেছি কিভাবে judgmental না হতে প্রথম দেখাতে কোন মানুষকে নিয়ে assume করার একটু বাজে স্বভাব ছিল আমার জুলহাজ ভাই সবাইকে একই পাল্লায় মাপতেন। উচ্চ পদের সাহেব টাইপের লোকদের যেভাবে বরণ করতেন পল্লীগ্রামের মানুষকেও একই আন্তরিকতায় গ্রহণ করতেন তিনি সবসময় মানুষের সেরা দিকটিই দেখতেন এবং তাদের উপর বিশ্বাস রেখে শ্রেষ্ঠ গুনগুলো বের করে আনতেন

আমার এখনও মনে আছে, প্রথম দিকে আমি খুবই লাজুক ধরণের ছিলাম সহজে মিশতে পারতাম না উনি খুবই আন্তরিকতার সাথে আমাকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন যেখানে কোন কোন কাজে আমার নিজের আত্মবিশ্বাস ছিলনা সেখানে উনি আমার উপর পুরো আস্থা রেখে বিশ্বাস যোগান দিতেন ছোট থেকে বড় সকল বিপদে তার কাছে ছুটে যেতাম কখনো পরামর্শ নেয়ার জন্য তো কখনো সরাসরি সাহায্যের জন্য নতুন নতুন যেসব ছেলে-মেয়ে আসত বা আমাদের কাজের সম্পর্কে যাদের তেমন ধারণা ছিল না বা যাদের অল্প ধারনা ছিল, তারা প্রায়ই জিজ্ঞেস করতউনি কি তোমাদের leader? না, উনি কখনো নিজেকে leader দাবী করতেন না কিন্তু কিছু কিছু মানুষের কিছু গুণ প্রতিফলিত হয় আপন মহিমায় কি এক অবয়ব আকর্ষণে উনি আমাদের সবার পিতৃতুল্য বা বড় ভাইয়ের মত এক figure- পরিণত হয়েছিলেন বিচক্ষণতার গুণে উনি আমাদের সবারই বিশ্বাস অর্জন করেছিলেন। তাই তার যে কোনো কথা/আদেশ চোখ বন্ধ করে পালন করা যেত
       
জীবনে এখন যাই করিনা কেন তার আদর্শে উৎসারিত আমার সকল সিদ্ধান্ত   

আমরা জীবনের কোন না কোন সময় ‘আইডেন্টিটি ক্রাইসিস’ বা পরিচয়-হীনতায় ভুগি। আমিও এর ব্যতিক্রম ছিলাম না। এক সময় ক্রাইসিসটা খুব ভুগাচ্ছিল আমায়। সেই সময়ে আমার পরিচয় হয় তনয়ের সঙ্গে।  

২০১২ সালের দিকের কথা। তখন আমি প্রথম ফেসবুকের মাধ্যমে জানতে পারি আমার মতো অনেক সমকামী আছে ঢাকা শহরে। তারা একটি ভিন্ন নাম ব্যবহার করে ফেসবুক আইডি চালায়। আমিও সেরকম একটা ফেইক নাম দিয়ে আইডি খুলে বসি। আর সেটা দিয়ে সমমনা মানুষদের খুঁজতে থাকি। সেখানে তনয়ের সঙ্গে পরিচয়। তার আইডি নাম ছিল সামির থ্রণ। আমি ওকে জিগ্যেস করেছিলাম, এটা কি তোমার রিয়েল আইডি? সে বলেছ, হ্যাঁ! কেন নয়?  

তখন নতুন আইডি খুলে চালানোর মজাই আলাদা ছিল। নতুন এক পরিচয় তৈরি করে জগতের মানুষের সঙ্গে আলাপচারিতা করার মধ্যে এক চাপা উত্তেজনা কাজ করতো। যখন নতুন এলাম তখন বেশ নিরাপত্তা-হীনতায় ভুগতাম। সব কিছুই নতুন। ফেসবুকে দীর্ঘদিন যাবত যাদের সঙ্গে কথা হতো তাদের সঙ্গে মূলত দেখা করতাম। তাও বহুদিন সময় নিয়ে। যেহেতু তনয় আমার সিনিয়র ছিল সেহেতু তনয়ের সঙে এ নিয়ে আলাপ করতাম। ও আমাকে সবসময় সাপোর্ট দিতো। 

আমি ওকে জিগ্যেস করেছিলাম, তোমার কি একটাই আইডি? সে উত্তরে বলল, হ্যাঁ। একটাই। এখানে আমার সব পরিচিত মানুষদের অ্যাড করা আছে। আমি তারপর খুব কৌতূহলী হয়ে জিগ্যেস করলাম, তোমার ভয় লাগে না? ও উত্তরে বলল, ভয়? ভয় লাগার কি আছে?  

চ্যাটে অনেক কথা হতো। কিন্তু দেখা হতো না। আমার আবার নতুন কারোর সঙ্গে দেখা হলে বা কথা বললে ভালো লাগার মতো এক অনুভূতি তৈরি হয়। যখন এই ভালো লাগা আরও গভীর হতে লাগে তখন তা গাঢ় ও শক্ত বন্ধুত্বে পরিণত হয়।  খুবই সুন্দর এক অনুভূতি!  

আমি আমার মতো থাকতে খুব পছন্দ করি। ভণিতা করতে আমি পারি না। তাই একটা পর্যায়ে আমার ভার্সিটি ফ্রেন্ডদের সাথে ঘুরাফেরা বন্ধ করে দেই। অভিনয় করে চলাটা আমার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। আমি তনয়কে মাঝেমধ্যে এ নিয়ে কথা বলতাম। সে বলত, তুমি যেরকম সেরকম থাকো। কোন অভিনয় করার প্রয়োজন নেই। আমাদের কমবেশির সবারই বাহ্যিক আচরণে একটু মেয়েলী ভাব আছে। আমি একবার বললাম, জানো আমার হাঁটা নিয়ে সবাই হাসাহাসি করে ছোটবেলা থেকেই। আমাদের চলাফেরায় সমস্যা, আমরা ম্যানলিভাবে হাঁটতে পারি না। কোমর দুলিয়ে দুলিয়ে হাঁটি। তোমার আগের ছবিও দেখেছি। ফেসবুকে অনেক ধরণের ছবি ছিল। ক্রস-ড্রেসিং এর। কিভাবে তুমি এরকম মাল্টিপল পারসোনালিটি ধারণ করো? ও উত্তরে বলল, অভিনয়। আমাদের জীবনের সবকিছুই অভিনয়। আমরা নিজেরা নিজেদের সাথে অভিনয় করি। সমাজের সাথে অভিনয় করি। এবং আমার ব্যাপারটা হল আমি অনেক ভালো অভিনয় করি বলে এখন সব ঠিকঠাক। আমি অনেক বছরের পর বছরের অনুশীলনের মাধ্যমে নিজেকে ঠিক করতে পেরেছি।  

তনয়ের সে কথা আমার জন্য অনেক বড় মোটিভেশন ছিল।  

আমার মধ্যে মজার এক উপলব্ধি আছে। যারা খুব বেশি কমিনিউটিতে যাতায়াত করে না, যারা নতুন আসে বা যারা আশপাশ চিনে না, তখন তারা হঠাৎ করে কাউকে ক্রস-ড্রেসিং করতে দেখলে একটা নেতিবাচক অনুভূতি সঙ্গে সঙ্গে তৈরি হয়। আমার মধ্যেও কাজ করতো। তনয়সহ আরও বন্ধুদের ক্রস-ড্রেসিং করতে দেখলাম। বিভিন্ন প্রোগ্রামে তাদেরকে বিভিন্ন অবতারে দেখলাম। তারা পারফর্ম করছে, ছবি তুলছে, নাচছে। বিনা কোন সংকোচে! আমার এক পর্যায়ে ব্যাপারটা গ্রহণ করতে শুরু করি। তারপর আমি নিজে পরবর্তীতে দুইবার ক্রস-ড্রেসিং করি। পারফর্ম পর্যন্ত করেছি। শুরু শুরুতে প্রচণ্ড অদ্ভুত লাগতো তবে ধীরে ধীরে একটা ভালো লাগা বলবো না তবে ঠিকঠাক ছিলাম। শুধু এক বহির আবরণ। এই নিয়ে এতো বাড়াবাড়ি করার কিছুই দেখি না!  

তনয়ের সৌন্দর্য তারিফের যোগ্য। এই জাঁদরেল গোঁফ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আবার এই বড় এক লাল টিপ কপালে লাগিয়ে, গলায় মুক্তার মালা পরে, টকটকে রক্ত লাল শাড়ি গায়ে নিয়ে দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। এ যেন নাটকীয় পরিবর্তন। যেন এক দেহ কিন্তু ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়।  

তনয়ের সবকিছুতেই নাটকীয় সৌন্দর্য ছিল - তা আমরা কেউ অস্বীকার করতে পারবো না। ওর কথা বলা, ওরা চলাফেরা সবকিছুর মধ্যে সৌন্দর্য। থিয়েটার ওর জীবনে অনেক বড় প্রভাব রেখেছিল। গোঁফ রেখেও শাড়ি পরত! কি সৌন্দর্য!  

আমি অবাক হতাম। খুব অবাক হতাম। 

আজ সে নেই। ভাবতে কষ্ট চেয়েও বেশি কিছু মনে হয়। হয়তো মাসের পর মাস যোগাযোগ থাকতো না তবে আমি জানতাম তনয় যেখানে আছে সেখানে ভালো আছে। চট করেই দেখে আসা যায়, কথা বলা যায়। আর এখন? জলজ্যান্ত মানুষটা মুহূর্তেই গত। 

এখনকার আমি অনেক আত্মবিশ্বাসী। নিজেকে নিয়ে গর্বিত। এর পিছনে, শুরুর দিকে যে উন্নতি হচ্ছিল তখন তনয় বেশ বড় উদ্দীপনা যুগিয়েছিল আমার মধ্যে।  

আমরা আপনাআপনি কোন এক নির্দিষ্ট ব্যক্তির কাছে নানাভাবে অনুপ্রেরণা পাই। তারা কিন্তু ধরে ধরে আমাদের অনুপ্রাণিত করে না। বলে না যে নাও এ দ্বারা অনুপ্রাণিত হও! তনয়ের অনেক আচরণ আমাকে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। সেটা মুখে কখনও বলে না বেড়ালেও, আমার নিজের জীবনের কিছু দিক দেখলেই বুঝতে পারি। আগেকার আমি আর এখনকার আমির মধ্যে বিশাল পার্থক্য আঙ্গুল দিয়ে আলাদা না করলেও আমি বুঝতে পারি। এ ক্ষেত্রে তনয়ের অনেক বড় লুকানো অবদান আছে। তার সাহস, তার আচরণ, তার চালচলন ও তার দর্শন আমাকে সবসময় মোহিত করতো এবং করবে। 

আমার ‘পরিচয়-হীনতা’ সিনড্রোম থেকে উদ্ধার করেছে, তনয়।  

 

জুলহাজ মান্নান। 

বাদামি রঙের পাতলা গড়নের ছোট্ট একটা মানুষ। যেদিন থেকে পরিচয়, একটা জিনিস নিয়ে তার সাথে মনের ভেতর অনেক ঈর্ষা হতো, সেটা আর কিছু না.. শুধুমাত্র তার সেই লম্বা রেশমী চুল. ২০০৭ এ পরিচয়, বড়ভাইয়ের মতোই শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসতাম। আজো বাসি। আমাদের মধ্যে অনেক মান-অভিমান চলতো। আমার বয়স তখন অনেক কম, সবকিছু বুঝতাম ও কম। বলতে পারেন খানিকটা পথপ্রদর্শক হয়ে আমাকে অনেক কিছু বুঝিয়েছেন, শিখিয়েছেন এবং নতুন করে অনেক কিছু দেখিয়েছেন। মাঝে মধ্যে যখন আমাদের মনোমালিন্য হতো, হঠাৎ করেই কিছুদিনের জন্য আমাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যেত আর ঐদিকে আমার মা বলতেন, 

-'কিরে তোর বড়ভাইটার কোনো খবর নেই যে, তুই কি কিছু করেছিস?' 

 ২৫শে এপ্রিল, ২০১৬। সন্ধ্যা ৭/৭৩০টা হবে। আমি সবে মাত্র অফিস থেকে ফিরে কাপড় ছেড়ে গোসলে যাবো। আমার ফোনটা বেজে উঠলো। হঠাৎ করে ওপাশ থেকে  আমার মা কান্না শুরু করলো। বাকিটুকু আর বলার প্রয়োজন নেই 

 এ কেমন দেশে বাস করি আমরা, যেখানে আমাদের কোনো ব্যক্তি স্বাধীনতা নেই? মত প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই? সংবিধান যেখানে রাষ্ট্রের সকল মানুষকে সম-অধিকার দিয়ে এসেছে সেখানে ১৮৬০ সালের পেনাল কোডের ৩৭৭ ধারা, ধর্মীয় মৌলবাদ আর সামাজিক সংকীর্ণতা আমার মতো লাখো বাংলাদেশী মানুষের জীবনকে আজ ভাবায় আমার মা  এরপর কি আমার মায়ের কোল খালি হবে?  

 মজার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশী বাঙালির মতো ভন্ড জাতি পৃথিবীতে আরো একটি আছে- পাকিস্তান। দুই দেশের মানুষের মধ্যে যে মিলটা আছে, সেটা কি কখনো ভেবে দেখেছেন? পশ্চিমের দেশে দেশান্তর হয়ে যেতে কিন্তু একপায়ে দাঁড়ানো, কিন্তু নিজের দেশকে পশ্চিমের মতো সভ্য বানাতে নারাজ। জেনে রাখা ভালো, সমকামিতা কোনো পশ্চিমা সংস্কৃতি নয়. একটু বই ঘাটুন. উত্তরটা স্বয়ং নিজেই পেয়ে যাবেন বলে আশা রাখি। 

আজ এই রঙ্গিন বসন্তে কিছু স্মৃতি ফিকে হয়ে যাচ্ছে আর কিছু দগদগে রক্তাক্ত ক্ষতের মত পীড়া দিচ্ছে৷ আজ প্রায় একবছর হতে চললো৷ গত বছর ঠিক এই বসন্তে মার্চের ১৭ তারিখেই কুমিল্লার ব্রাক লার্নিং সেন্টারে আয়োজিত হয়েছিল “রূপবান ইয়ুথ লিডারশীপ ট্রেইনিং প্রোগ্রাম”৷ খুলনা হতে কেবল আমিই গিয়েছিলাম সেখানে৷ যদিও অনেকেই যেতে চেয়েছিল, কিন্তু শেষ মুহুর্তে নানা সমস্যার অজুহাত দেখিয়ে কেউই গেল না৷ যেটা হয় আরকি, বাঙালীর তিন হাত; ডান হাত, বাম হাত আর অজুহাত৷ সে যা হোক, আমি এই ইভেন্টে অংশগ্রহণ করতে পেরে নিজেকে বেশ ভাগ্যবান মনে করি৷ জুলহাজ ভাই আর রূপবানের অনেকের সাথে দেখা হয়ে যায়৷ তাঁরা সাদরে আমাকে অভ্যর্থনা জানান৷ অনেক নতুন নতুন মানুষের সাথে পরিচয় হয়ে যায়৷ বাংলাদেশের নানা প্রান্তের বন্ধুদের সাথে বন্ধুত্বও হয়ে যায় খুব অল্প সময়ে৷ সেশনগুলি খুব ভালই চলছিল৷ একটি সেশনে তনয় ভাইকে দেখা গেল অর্ধ-নর আর অর্ধ-নারী রূপে৷ তোমরা যদি কখনো বহুরূপী কি তা না দেখে থাকো, তাহলে বুঝবে না যে একই অঙ্গে কত যে রূপ আর ব্যক্তিত্ব থাকতে পারে৷ তনয় ভাই মানুষটিও তেমনই ছিলেন৷ দূর্গার যেমন দশ হাত, তনয় ভাইয়েরও তেমনি দশ রূপ! যে কোন কিছুর অভিনয়, যে কোন চরিত্রে অভিনয়ে অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন তিনি৷ শখ ছিল, আমার প্রাণসখার হাত ধরে বেইলি রোডে যাব তনয় ভাইয়ের “সোনাই মাধব” দেখব, থিয়েটারে৷ সে শখ আমার আর পূরণ হলো না! 

যে কোন চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করে সেটিকে বাস্তবে রূপদান করার সুনিপুণ দক্ষতা ছিল তাঁর৷ আমি যখন প্রথম তাঁর সাথে কথা বলি, তখন তাঁর অমায়িক ব্যবহারে মুগ্ধ হয়েছিলাম৷ আমার লেখা কবিতার আবৃত্তি করেছিলেন তিনি৷ কবিতার নাম ছিল “শিখন্ডীর অনুযোগ”৷ পরবর্তীতে ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ই. এম. কে. সেন্টারে তা মঞ্চস্থ করেছিলেন তিনি৷ মঞ্চায়নের সময় একজন প্রকৃত “শিখন্ডী”-র রূপ ধারণ করেছিলেন তনয় ভাই৷ আবেগ আর অভিনয় দক্ষতার মাধ্যমে উপস্থিত দর্শক - শ্রোতাদের হৃদয়ে দাগ কেটেছিলেন আর তাঁদেরকে কাঁদিয়েছিলেন তনয় ভাই৷ আমার লেখা সাধারণ কবিতা তাঁর স্পর্শে হয়ে উঠলো “অসাধারণ”, এ যেন “মাইডাসের স্পর্শ”৷ 

সত্যিই জুলহাজ ভাই, তনয় ভাই আর রূপবানের সকল সদস্যবৃন্দ খুবই জ্ঞানী, গুণী আর প্রতিভাবান মানুষ৷ তাঁদের অনুপ্রেরণায় আমি নিজেকে আবিষ্কার করতে শিখেছি৷ তাঁদের অবদান আমি কখনই ভুলতে পারবো না৷

আজ তাই অনেকদিন বাদে, ভৈরব তীরের  এই নির্জন স্থানে বসে প্রকৃতির মাঝে আমি তাঁদের বিদেহী আত্মাদেরকে অন্বেষণ করছি আর স্মৃতির পাতা হাতড়াচ্ছি৷ যেমনটি কবি জীবনানন্দ বলেছেন; “আবার আসিব ফিরে ধানসিড়িটির তীরে— এই বাংলায়

হয়তো মানুষ নয়— হয়তো বা শঙ্খচিল শালিখের বেশে,

হয়তো ভোরের কাক হ'য়ে এই কার্তিকের নবান্নের দেশে

কুয়াশার বুকে ভেসে একদিন আসিব কাঁঠাল ছায়ায়;

হয়তো বা হাঁস হবো— কিশোরীর— ঘুঙুর রহিবে লাল পায়,

সারাদিন কেটে যাবে কলমীর গন্ধভরা জলে ভেসে-ভেসে;

আবার আসিব আমি বাংলায় নদী মাঠ ক্ষেত ভালোবেসে

জলঙ্গীর ঢেউয়ে ভেজা বাংলার এ সবুজ করুণ ডাঙ্গায়;

হয়তো দেখিবে চেয়ে সুদর্শন উড়িতেছে সন্ধ্যার বাতাসে;

হয়তো শুনিবে এক লক্ষ্মীপেঁচা ডাকিতেছে শিমূলের ডালে;

হয়তো খৈয়ের ধান ছড়াতেছে শিশু এক উঠানের ঘাসে;

রূপসার ঘোলা জলে হয়তো কিশোর এক শাদা ছেঁড়া পালে

ডিঙা বায়;-রাঙা মেঘ সাঁতরায়ে অন্ধকারে আসিতেছে নীড়ে

দেখিবে ধবল বক; আমারেই পাবে তুমি ইহাদের ভিড়ে-”

ভৈরবের তীরে তাই জুলহাজ ভাই আর তনয় ভাইকে খুঁজছিলাম বক আর শালিক পাখির দলে৷ এখানে পলাশ-শিমুল-মান্দার-অশোক ফুটে লালে লাল! বসন্তের কোকিল যেমন আগে ছিল, এখনও আছে ভবিষ্যতেও থাকবে হয়তো৷ কিন্তু ঋতুরাজই যদি না আসে তাহলে কোকিলদের অস্তিত্ব থাকবে কি? অনেকেরই বসন্ত আজ রঙ্গিন, আর আমার বসন্ত ধূসর!

ছোট ছোট স্বপ্নের নীল মেঘ

জুলহাজ মান্নান। নামটা সামনে আসলেই একজন মানুষের ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠে। একজন মানুষ যার সাথে আমার সম্পর্কটার কোন নাম আমি কখনোই দিতে পারি নি। ভালোলাগা, বন্ধুত্ব, দায়িত্ববোধ, শ্রদ্ধা সবকিছু ছিল সেখানে। সর্বোপরি আমাদের সম্পর্কের একটা ভাষা ছিল। ঠিক কবে কিভাবে মানুষটা আমার দিক নির্দেশক  হয়ে উঠল আমার মনে পড়ে না। তবে তার সাথে প্রথম পরিচয়ের কথা ভুলে যাবার নয়। ২ অগাস্ট, ২০০৫। আমাদের প্রথম দেখা। সংসদ ভবন এলাকায়। ফতুয়া আর জিন্স পড়া হ্যাংলা পাতলা একজন মানুষ। কথায় কথায় কখন যে সন্ধ্যা পেরিয়ে গিয়েছিল। তার বাচন ভঙ্গি, নানান বিষয়ে জ্ঞান, প্রাণোচ্ছল হাসি, কোন সামান্য ঘটনাকে অভিনয় করে অনেক মজার করে তুলে ধরা; বিশেষ করে “ হাই দাইয়া!বাস ভি কারো! লোক ক্যা কাহেঙ্গে?” ইয়াহু চ্যাটের খুব মজার এক ই-মো চরিত্রকে নিয়ে সে যে মিমিক্রি করতো! এসব খুব সহজেই আমাকে আকর্ষণ করেছিল।    

ঢাকা ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে, কখনো ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে কতটা দিন আমরা আড্ডা দিয়েছি তার ইয়ত্তা নাই। ঢাকা শহরের সবকিছু নতুন ছিল আমার কাছে। জুলহাজ ভাই চিনিয়েছিল সব। কোন রেস্টুরেন্টের বিরিয়ানি ভালো, কোন বেকারির কেক ভালো অথবা কোথায় ভালো চটপটি পাওয়া যায়, সব যেন তার নখদর্পণে ছিল। শাহবাগ থেকে জুলহাজ ভাই মাঝে মাঝেই একগাদা করে ফুল কিনত। আমি অবাক হয়ে যেতাম। কারণ সে অনেক বেছে বেছে বাঁকা বাঁকা ডাটা যুক্ত ফুল কিনত। সে জারবেরা হোক, আর গ্লাডিওলাসই হোক। আমার অবাক তাকিয়ে থাকার কারণ বুঝে মাঝে মাঝে ছলনার হাসি দিত। বাসায় যাবার পর যখন ফুলগুলো স্বচ্ছ কাঁচের জারে সেগুলো সাজাতো, আমি তার ছলনার হাসির কারণ বুঝতে পারতাম। তখন ফুলগুলো যেন নতুন এক রূপ পেত। এরকম হাজারো স্মৃতি আছে তার সাথে। খুব ছোট ছোট স্মৃতি হলেও তার শিল্পী মনের পরিচয় আমাকে তার ব্যাপারে মনযোগী করে তুলেছিল বার বার। মাঝে মাঝে অনেক ঈর্ষা হতো। মনে হতো, ইস আমি যদি তার মতো হতে পারতাম।   

জুলহাজ ভাইয়ের আই.আর এর কিছু বন্ধুর সাথে সেসময় প্রচণ্ড ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল আমার। একসাথে কত যে সুন্দর সময় পার  করেছি, বলে বুঝানো সম্ভব নয়। সবার মধ্যমণি জুলহাজ ভাই। প্রাণোচ্ছল একজন মানুষ। কারো মন খারাপ, কারো মন ভীষণ ভালো, সেই অনুভূতিগুলো অনায়েসে জুলহাজ ভাইয়ের সাথে শেয়ার করতে দেখেছি আমি। ধানমণ্ডি ৩২ এর বজরা ছিল প্রতি সন্ধ্যার আড্ডাখানা। কে কখন কি খাচ্ছে, কে কখন খাবার বিল দিচ্ছে, সে এক দেখার মত ব্যাপার ছিল। রাত বেশি হয়ে গেলে আমি জুলহাজ ভাইয়ের বাসায় চলে যেতাম। ওদের শ্যামলীর বাসায়। এত রাতে চুপিচুপি দরজা খুলে, কোন শব্দ না করে দুজন এক দৌড়ে চলে যেতাম শোবার ঘরে। কখনো এরকম হয়েছে, আমরা দৌড় দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছি আর তখন দেখা গেলো লিভিং রুমে অ্যাংকেল বা অ্যান্টি বসে আছেন। সেদিন শোবার রুমের দরজা বন্ধ করে আমরা দুজন প্রচণ্ড হাসতাম। জুলহাজ ভাইয়ের বাসায় যাব, আর চকলেট কেক খাবো না, তা হতো না কখনো। এ যেন একধরণের আবদার হয়ে গিয়েছিল। তার আর আমার পারিবারিক নামের প্রচণ্ড রকম মিল কে কেন্দ্র করে অনেক মজার ঘটনার সম্মুখীন হয়েছি বহুবার।    

আমার জীবনে বাবা-মাকে ছাড়া প্রথম জন্মদিন আমি পালন করি জুলহাজ ভাইয়ের সাথে। অন্যভাবে বলতে গেলে, জুলহাজ ভাই আমাকে মনে রাখার মত একটি দিন উপহার দিয়েছিল। সেদিন ২ ডিসেম্বর, ২০০৫। আমার বাসায় খুব সকালে এসে উপস্থিত হয়েছিল, সাথে অনেক ফুল আর চকলেট কেক। তার সেদিন অনেক প্ল্যান। আমরা রিক্সা নিয়ে টিএসসি এলাকায় অনেক ঘুরেছিলাম সেদিন। বিকেলে কি এক সারপ্রাইজ আছে, জানিয়েছিল আগেই। বিকেলে আমরা গ্রিন রোডের একটা রেস্টুরেন্ট “ জলি বি “ তে গেলাম। জানলাম সেখানে বয়েজ অব বাংলাদেশ (বব) এর ফিল্ম শো হবে। জেনে আমি চরমভাবে পুলকিত হয়েছিলাম। কারণ এটা ছিল আমার জীবনের প্রথম বব এর কোন প্রোগ্রাম। তাকিয়েছিলাম তার দিকে। তার ঠোঁটে ছিল ছলনার হাসি। আমি জড়িয়ে ধরেছিলাম আনন্দে। রেস্টুরেন্টের ভিতরের দিকে সকল আয়োজন করা হয়েছিল। ববের তৎকালীন ভলেন্টিয়ারদের সাথে পরিচয় হয়েছিল সেদিন প্রথম। দেখেছিলাম "দ্যা ট্রিপ" মুভিটি। মুভি শেষে হঠাৎ শুনতে পেলাম আমার জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে ঘোষণা জানানো হল। আমি হতবাক হয়ে তাকালাম জুলহাজ ভাইয়ের দিকে। তার ঠোঁটে তখনো ছলনার হাসি।  

এভাবে জীবন পথে চলতে চলতে কেটে গেছে অনেকটা সময়। একসময় আমি পুরাদস্তুর ঢাকাবাসী হয়ে গেলাম। ঢাকা শহরের অলি-গলি চিনতে লাগলাম। কিন্তু জুলহাজ ভাইয়ের সেই দ্বিধাহীন সঙ্গ খুব মিস করতাম। তার খুব সুন্দর করে, গুছিয়ে বুঝানোর যে ক্ষমতা আমি দেখেছি, সেই অভিজ্ঞতাকে মিস করতাম। দুজন দুজনের মত করে ব্যস্ত হয়ে গেলাম। কিন্তু যোগাযোগের আরও অনেক মাধ্যম আমাদের মাঝে তৈরি হয়েছিল। এই একটা মানুষ যার কাছে সম্পর্কের যে নতুন সংজ্ঞা আমি জেনেছিলাম, আজও আমি তা বহন করে চলেছি। তার “ না “ বলার ক্ষমতা যেমন অসাধারণ ছিল, তেমনি অঙ্গীকারের জায়গাটা ও ছিল অনেক স্বচ্ছ। 

আমার জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোতে যেমন তাকে পাশে পেয়েছি, তেমনি চেষ্টা করেছি তাকে তার যথাযথ সম্মানটুকু দিতে। যাদের সাথে কাজ করেছি সবসময়, আমার গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোতে তাদের অনেক সময় পাশে পাইনি। কিন্তু সেই মানুষটি সবকিছুর ঊর্ধ্বে থেকে আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে, আমাকে যেমন শুভেচ্ছা জানিয়েছে, তেমনি সচেতন করেছে। এরকম একজন মানুষকে ভালো না বেসে কি কোন উপায় আছে? জুলহাজ ভাই আমার বাসায় আসবে, আর তার জন্য “চা” প্রস্তুত থাকবে না, এটা হতো না। আবার তার লিভিং রুমের সিরামিক ব্রিক আর আমার বাসার সিরামিক ব্রিক একই রকম; বিধায় আমি তার ডিজাইন চুরি করেছি বলে আমাদের দুইজনের যে খুনসুটি- আমার প্রতি তার এক অদেখা দাবি, বা তার প্রতি আমার এক অদেখা আবদার, এ যেন এক মিষ্টি- মধুর ব্যাপার হয়ে গিয়েছিল।  

তার জীবনের শেষদিনটিতে এসে তার পাশে দাঁড়াতে না পারার যে গ্লানি, এটা আমাকে সারাটা জীবন তাড়া করে ফিরবে। আমি  জানি, তাকে ঘিরে আমার প্রচণ্ড ভাল লাগার যে জায়গাটা; সেটা কখনও কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। আমি জুলহাজ ভাই কে বলেছিলাম, আমার ওয়াটার গার্ডেনে যেদিন শাপলা ফুল ফুটবে, সেদিন আমি ফেসবুকে ছবি দেব। সাথে লিখে দেব “ ইন্সপায়ারড বাই জুলহাজ মান্নান “। আমার সে দিনটি আর আসেনি...    

চৈত্রদাহে ঘুম ভাঙেনি, উপরি ভোর রাত থেকেই প্রকৃতি বেশ ঠান্ডা মেজাজে আছেন আজ। বৃষ্টি ঝরছিলো কখন থেকে টেরও পাইনি। সকালে উঠি উঠি করেও উঠতে ইচ্ছে করছিলোনা, শরীরে ডালপালা মেলেছে রাজ্যের আলস্য। ঠিক করলাম, ‘আজ আমি কোথাও যাবোনা’।

  আহারে বৃষ্টি, কত শত স্মৃতি এই বৃষ্টি নিয়ে! এরকমই কোন একটা বৃষ্টিস্নাত ছুটির দিনে জুলহাজ ভাইয়ার ঘরে বসে কথা হচ্ছিলো তাঁর সাথে, কথায় কথায় উনি শুনতে চাইলেন আমার ছেলেবেলার বাদলা দিনের মজার কোন স্মৃতি। আমি শুরু করলাম।

 ‘আমার একটা বন্ধু ছিলো স্কুলে, হৃদয় নামের। মধ্যাহ্ন বিরতির পর, বর্ষাকালে প্রায় প্রতিদিনই তার দেরি হতো ক্লাসে আসতে। তাই ওর জন্য রীতিমতো বাঁধাধরা ছিলো কেমিস্ট্রির মুস্তাফা স্যারের বকুনি। 

-‘হৃদয়, আজও দেরি! কেন এমনটা হলো তোর?’ 

ওর রোজ একই কথা

- ‘সরি স্যার, বৃষ্টির জন্য দেরি হয়ে গেলো’। 

স্যার ভেবে কুল পেতেন না, ছেলেটার ছাতা নেই নাকি!’ 

-‘আসল ঘটনা ছিলো কি?’-আমি বললাম।  

ঈষৎ হেসে জুলহাজ ভাইয়া বললেন, 

-‘কি?’ 

-‘ব্যাপারটা হলো ওর একটা বান্ধবীর নাম ছিলো বৃষ্টি। প্রতিদিন টিফিন ব্রেকে হৃদয় গার্লস স্কুলের সামনে গিয়ে ওকে একবার করে দেখে আসতো। কিশোর বয়সের আবেগী প্রেম বটে, কিন্তু সে মিথ্যে বলার মতো ছেলে ছিলো না মোটেও’। ‘স্যার জিজ্ঞেস করতেন, তোর দেরি হলো কেন রে? হৃদয় নিরীহ ভাবেই জবাব দিতো, স্যার বৃষ্টির জন্য। ও সত্যি কথাই বলতো, কিন্তু মুস্তাফা স্যারের কোনদিনও জানা হলোনা কোন বৃষ্টি ওকে দেরি করিয়ে দিতো’।

 জুলহাজ ভাইয়া হা হা করে হেসে উঠলেন। ততক্ষণে আমি কিছুটা চমকিত! আমি উনাকে বেশিরভাগই দেখেছি চুপচাপ শান্ত একজন মানুষ হিসেবে। উনি যে এভাবে প্রাণ খুলে হাসতে পারতেন ততদিনেও আমি সত্যি জানতাম না! উনি ছিলেন প্রায় আমার মায়ের কাছাকাছি বয়সী একজন মানুষ, কিন্তু তাঁর বয়স আমাদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কে প্রভাব ফেলেনি কখনো। 

 তাঁকে আমি বছর কয়েক ধরে জানতাম। আমার কাছে তিনি ছিলেন পরম আস্থার, শ্রদ্ধাভাজন একজন মানুষ। সময়ের সাথে তৈরি হওয়া আস্থায় আমি নিজের অনেক ব্যক্তিগত সমস্যায় তাঁর পরামর্শ চেয়েছি, উনি আমাকে বুঝতে শিখিয়েছিলেন আমরা চেষ্টা করলেই সুখী হতে, সুখে থাকতে এবং প্রিয় মানুষগুলোকে সুখে রাখতে পারি।

 আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিলো কর্মসূত্রে, আমার ও বাবুর একটা ইভেন্টের ভ্যেনুর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন উনি- নিজেই উপযাজক হয়ে। এরপর আমরা ‘সখিনার ঘর’ ও জুলহাজ ভাইয়ার সমর্থন পেয়েছি বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন কাজে, বহুবার। একসাথে কাজও করেছি বিভিন্ন সময়। তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সংগঠক, তাঁর আচরণ কখনোই কতৃত্বপূর্ণ ছিলোনা। কিন্তু তাঁর নেতৃত্বগুণ ছিলো অসামান্য। তিনি ছিলেন সদালাপী একজন মানুষ, তাঁকে কখনো খুব বেশি রাগতে বা কটূ ভাষা ব্যবহার করতে দেখিনি আমি। অনিয়মের মধ্যেও মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ চালিয়ে যাওয়ার যে অদ্ভুত গুণ তাঁর ছিলো, আমি তা নিজের মধ্যে ধারণ করেছি, তিনি আমার কাছে একজন অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে থাকবেন সবসময়। 

 যা আমাকে আজও পীড়া দেয় তা হলো তাঁর শেষের দিনগুলোতে তাঁকে খুব বেশি সময় দিতে পারিনি আমি। তিনি খুব করে চাইতেন আমি তাঁর ‘ইয়ুথ লিডারশিপ প্রোগ্রামে’, আর ‘রূপবানে’ একটু বেশি সময় নিয়ে, সামনের দিকে থেকে কাজ করি। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের মাঝামাঝি সময়ে। ক্লাস, পরীক্ষা, গবেষণা সহযোগীর কাজ, নিজেদের সংগঠনে সময় দেয়াসহ নানা কারণে তাঁকে যতটা সময় দেয়া উচিত ছিলো ততটুকু দিতে পারিনি।  

তিনি চেয়েছিলেন রূপবানে আমার লেখা ধারাবাহিক ‘গ্রীক মিথলজি’ নিয়ে একটা সিরিজ করতে। তাঁর সাথে অনেক ভালো কাজের সুযোগ আমি হারিয়েছি। তিনি কি আমার উপর কিছুটা অভিমান, কিছুটা কষ্ট নিয়ে পৃথিবী ছেড়ে গেলেন? আমি দুঃখিত জুলহাজ ভাইয়া, রুপংক্তিতে লেখা না দেয়ার জন্য, আমি দুঃখিত ইয়ুথ লিডারশিপে সময় দিতে না পারার জন্য, আমি দুঃখিত- রূপবানের সাথে কাজ করতে না পারার জন্য। আমি আসলে ভাবতেও পারিনি আপনি এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন। যাওয়ার সময়ও আপনি আমাকে শিখিয়ে গেলেন, ‘যখনই কোন ভালো কাজের সুযোগ পাই তখনই তা কাজে লাগানো উচিত আমাদের, পরে একই সুযোগ আমরা নাও পেতে পারি’। জীবন কি নির্মম! 

ভেবেছিলাম ভবিষ্যতে নিশ্চয় আমরা একসাথে আরও অনেক কাজ করবো। করতামই তো! যদিনা সেই নরকের কীটগুলো তাঁকে আমাদের থেকে ছিনিয়ে নিতো! তিনি তাঁর-আমার মতো মানুষদের অধিকার নিয়ে, সর্বোপরি মানবাধিকার নিয়ে আজীবন কাজ করে গেলেন, সেই মানুষটাকে ‘মানুষরূপী’ কিছু জানোয়ার কি নির্মম ভাবে হত্যা করলো!  

 সেইসাথে তনয় ভাইয়া! আমার আরও কাছের একজন মানুষ! কি প্রাণবন্ত একটা মানুষই না ছিলো সে! ছোট্ট ভাইটার মতো আদর করতো আমায়। কোন কস্টিউম বা উইগের দরকার হলে, কিংবা কিভাবে নিবো হ্যালোউইনে ভ্যাম্পায়ারের সাজ- নাট্যকর্মী তনয় ভাইয়ার পরামর্শ ছিলো আমার কাছে অত্যাবশ্যকীয়। এই সৃষ্টিশীল মানুষটা সবার খুব দেখাশোনা করতো। আর কি চমৎকার ছিলো তাঁর সাবলীল অভিনয় আর স্পষ্ট উচ্চারণ! এখনও যেন গমগম করে কানে বাজে। আমাকে সে রেগে গেলে আপনি করে বলতো, অন্য সময় কখনো তুই, কখনো তুমি। আড্ডা’য় কাজ করার কথা ছিলো তাঁর, হয়ে উঠেনি। তাঁর অভাব পূরণ হওয়ার নয়। 

 জুলহাজ-তনয়, বড্ড অকালে চলে গেলেন তাঁরা, এভাবে তো যাওয়ার কথা ছিলোনা! কি আশ্চর্য দেশে বাস করছি আমরা! এখনও পর্যন্ত কোন বিচার হলোনা, কেউ গ্রেপ্তার হলোনা! রাষ্ট্র না দিলে এদেশে মাথা উঁচু করে বাঁচার নিরাপত্তা কে দেবে আমাকে? তাঁরা গেলেন। এরপর কে? আমি? নাকি আমার অন্য কোন সহকর্মী? কে দেবে জবাব? 

তাঁদের অকাল প্রয়াণে আমি হারিয়েছি ভাই, বন্ধু, ও সহকর্মীকে, আর হতভাগ্য এ দেশমাতা হারিয়েছে তাঁর আরও দু’জন সূর্যসন্তানকে। আমাদের অস্তিত্বের জানান দিয়ে, নিজেদের অধিকার আদায়ের আন্দোলনে আমরা যতটুকু এগিয়েছিলাম, সেই অভিশপ্ত কালো দিনটার পর আমরা আবার ঠিক ততটুকুই পিছিয়ে গেছি। অভিজিৎ রায়, জুলহাজ-তনয় সহ সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া সকল মুক্তমনা ব্লগার-এক্টিভিস্ট হত্যাকান্ডের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছি আমি, সেইসাথে আমাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপ ও এই ব্যাপারে রাষ্ট্রের একটি সুদৃঢ় অবস্থান পরিষ্কার করার জন্য দেশের সকল মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সম্মিলিত আওয়াজ দাবী করছি।  

 জুলহাজ মান্নান কিংবা মাহবুব তনয়ের মতো অকুতোভয় মানুষেরা কখনো মরেননা, তাঁদের আদর্শ আর চেতনার বহ্নিশিখা কখনোই কোন উগ্রবাদী সন্ত্রাসীদের থাবায় নিভে যাওয়ার নয়। আমরা, তাঁদের পরবর্তী প্রজন্ম- তাঁরা যে অধ্যায় শুরু করেছিলেন তা সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবো, তাঁদের স্মরণে এই হোক আমাদের প্রত্যয়। 

জুলহাজের বন্ধু তনয়! 

“সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে, শোনো শোনো পিতা।

কহো কানে কানে, শুনাও প্রাণে প্রাণে মঙ্গলবারতা”॥

তনয় এর খুব পছন্দের একটি গান। প্রায়ই সে গুন গুন করে গাইত গানটি। যদিও ওর পছন্দের গানের তালিকা অনেক বড়। গান গাইতে বললেই শোনাত। ভণিতা করতো না অনেকের মতন। মূলত থিয়েটার বিষয়ক একটা কাজের সহায়তার জন্য তনয়ের সাথে আমার পরিচয় ২০১৩ সালে। তখন বয়েজ অব বাংলাদেশের “প্রণয়নামা” অনুষ্ঠানে আমরা একটি ছোট মঞ্চ-নাটিকা এর মতন করতে চাই। পারদর্শী ও অভিজ্ঞ মানুষের অভাব। এক টিভি চ্যানেলে ওর একটা সাক্ষাৎকার দেখে সেই খাতিরে যোগাযোগ করা। কথা হল। দেখা হল। কাজের কথার ফাঁকে ফাঁকে ওকে জানা হল। যথেষ্ট ইন্টারেস্টিং ও গভীর মানুষ বলে মনে হল। সে যথেষ্ট ধৈর্য ধরে আমাদের ছেলেমানুষি নাটকের কাজ প্রায় ৫০ ভাগ এগিয়ে দিল। একটা বার কোনও অভিযোগ বা সমালোচনা না করে মুল অনুষ্ঠানে লাইট আর মিউজিক এর কাজও সে করে দিল। করে ফেললাম আমরা বাংলাদেশের প্রথম সমকামী প্রেমের গল্প নিয়ে করা কোন একটা ছোট মঞ্চ-নাটিকা। এভাবে তনয় এর আমাদের সাথে ধীরে ধীরে অ্যাক্টিভিজমে জড়িয়ে পরা। সে পুরাদস্তুর একজন মঞ্চ-নাট্য কর্মী। একযুগেরও বেশি সময় ধরে লোকনাট্য দলে ওর যাতায়াত। আমরা দল বেঁধে তার নাটক দেখতে যেতাম, ‘কঞ্জুস’ এর কালা মিয়া বা ‘লীলাবতী আখ্যান’ এর মহারাজা হিসাবে ওকে দেখতাম। ওর অভিনয়ে অনেক অবাক হতাম। কিভাবে পারে? 

ক্যারিয়ার নিয়ে ওর মধ্যে প্রায়ই হতাশা দেখতে পেতাম। সারাক্ষণই নাটকের দলের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ওকে দেখতাম ছুটাছুটি করতে। এরপর যোগ হল বয়েজ অব বাংলাদেশের স্বেচ্ছাসেবকের কাজ। মাঝে মাঝে অবাক হয়ে বলতাম গ্রাজুয়েশনটা করলে না টাকার অভাবে আর এদিকে নিজের জীবন দিয়ে দিচ্ছ সব স্বেচ্ছাসেবক কাজে, যেখানে টাকা তো আসেই না উল্টো পকেট থেকে যায়। সে কথাগুলো ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে বলত, “বুঝবেনা তুমি এসব প্যাশন”। ২০১৪ সালে বয়েজ অব বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসের অনুষ্ঠানে সে মুঘল সাম্রাজ্যের সূফী কবি শাহ্‌ হুসেইন ও তার ব্রাহ্মণ প্রেমিক মধু লাল কে নিয়ে একটা 'স্যাডো পাপেট' পরিবেশন করে। অনেক এক্সপেরিমেন্টাল ছিল সেটা। খুব অল্প সময়ে করাতে হওয়ায় তনয় নিজে তেমন সন্তুষ্ট ছিল না তাই তার পরিকল্পনা ছিল এটাকে সে বড় আকারে কোন একটা মঞ্চে আবার পরিবেশন করবে। যেন মানুষ জানতে পারে এই হারিয়ে যাওয়া প্রেমের গল্পটি। সেটা আর তার করা হল না। 

২০১৪ এর শেষের দিকে কিছু ব্যক্তিগত সমস্যায় আমরা কজন বয়েজ অব বাংলাদেশ ছেড়ে দেই এবং আমি আর তনয় রূপবানে জয়েন করি এক্সিকিউটিভ কমিটি মেম্বার হিসাবে। তনয় হয় জেনারেল সেক্রেটারি  আর জুলহাজ মান্নান প্রেসিডেন্ট। রূপবানের জন্য সকল দৌড়ঝাপ তনয়ই বেশি করতো। সেগুলো চাইলেও জুলহাজ ভাই তার কাজের ক্ষেত্রের কিছু দায়বদ্ধতা থেকে পারতেন না। তিনি সবসময় চাইতেন মানুষ রূপবান বলতে তনয়কে চিনবে। সেটা রূপবান ইয়ুথ লিডারশীপ প্রোগ্রাম হোক বা হোক পিঙ্ক স্লিপ কিংবা ম্যাগাজিন বা ‘রূপঙ্‌ক্তি’র প্রকাশনার কাজ। বলতেই হয় ' রূপঙ্‌ক্তি' ওর কাছে কতোটা আবেগের একটা প্রোজেক্ট ছিল। শেষ সময়ে প্রকাশক খুঁজে বের করা, ২ দিন লাগিয়ে প্রুফ রিডিং করে একুশে বইমেলায় উদ্বোধনের মতন অসাধ্য সাধন করাটা ও বলেই সম্ভব হয়েছিল। ২০১৫ সালের একুশের বইমেলাতে অভিজিৎ রয় খুন হওয়ার পরদিন ছিল আমাদের ' রূপঙ্‌ক্তি'র প্রকাশনার উদ্বোধন তাও অভিজিৎ রয়ের বইগুলোর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান শুদ্ধস্বর থেকে। সেই ভয়কে জয় করে আমাদের বইমেলায় যাওয়াই হতো না যদি জুলহাজ ভাই আর তনয় সাহস যোগাতো। 

মঞ্চনাটকের সাথে এতো বছর জড়িত থাকতে থাকতে ওর মাঝে 'ইম্প্রোভাইজেশন' এর ব্যাপারটা সহজাত হয়ে গিয়েছিল। আমাদের কারো কারো কাছে ব্যাপারটা অপছন্দনীয়ও ছিল বটে। জুলহাজ ভাই প্রায়ই ওকে বকা দিতেন আর বলতেন আমাদের মিটিং-এ, “আপনার অনেক পটেনসিয়ালিটি আছে কিন্তু এভাবে অলসতা করে ইম্প্রোভাইজেশন দিয়ে আর কতদিন? কাজের মান তো কমে যাচ্ছে আপনার”। মিথ্যা বলা হবে যদি না স্বীকার করি যে আমরা বিভিন্ন কাজে যতবার ঝামেলাতে পড়েছি, তনয়ের ইম্প্রোভাইজেশন কোয়ালিটির গুণে সেখান থেকে ঠিকই উতরে গিয়েছি বা পাশ কাটাতে পেরেছি। এখন সেটা বুঝতে পারি। সত্যি কথা বলতে গেলে এটা আমাদের অনেক কাজে সাহায্য করেছে। অনেক কিছু সে সহজে ম্যানেজ করে ফেলতে পারত। কত প্রোগ্রাম বা ইভেন্ট সে স্বল্প খরচে করে ফেলত! আইডিয়া ওর মাথায় গিজগিজ করতো। 

কমিউনিটির কিছু মানুষ ওকে আগাগোড়া অপছন্দ করত। কিছু কারণ আমাদের দুজনেরও অজানা ছিল। ব্যক্তিগত ক্লেশ বা ক্ষোভ থেকে হতে পারে যদিও। সেই মানুষগুলো মাঝে মাঝে ওকে কারণে অকারণে সবার সামনেই অপমানসূচক কথা বলতে ছাড়ত না। সে হাসিমুখে সব কথা হজম করে নিত। আর দিন শেষে ফোনে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমাকে বলত। প্রথমদিকে চেষ্টা করেছিল তাদের প্রিয় পাত্র হতে কিন্তু ফলপ্রসূ হয়নি। অনেক বলেছি একটু একহাত দেখে নাওনা কেন ওদের! আমিতো ছেড়ে দিতাম না। কিন্তু সে বলত, একদিন ওরা ওদের ভুল বুঝতে পারবে। মাঝে মাঝে যদিও ভেঙ্গে পড়তো আর বলতো, হয়তো তাদের ঘৃণা আমি ডিসার্ভ করি আসলেই। আমি নিজেও মাঝে মাঝে নিজ উদ্যোগে চাইতাম তাদের ভুল ভাঙতে কিন্তু ওর বারণের কারণে পারতাম না। জুলহাজ ভাইও আশা করতেন এসব একসময় ঠিক হয়ে যাবে ধীরে ধীরে। 

ওর কাছে কমিউনিটি ছিল হাঁফ ছাড়ার জায়গা। এখানে তাকে অভিনয় করতে হতো না। নিজের মতন আচরণ, চলন বলনের সুযোগ ছিল। চাইলে একটা শাড়ী বা গাউন পরে ফেলা যেত। পুরুষালী মোচ নিয়ে মেয়েলী কাপড়ে ওকে কেন জানি মানিয়ে যেতো। নিজেকে সে প্যানসেক্সুয়াল বলত। ওর ভাষায়, “ভালোবাসার আবার লিঙ্গ কি”? এতো ভারি শরীর নিয়েও সে সুন্দর বেলি ড্যান্স করতে পারত! যেকোনো কমিউনিটির প্রোগ্রাম হলেই ওর ডাক পড়ত। প্রোগ্রাম পরিকল্পনা বা পারফরম্যান্স, যা করতে মানুষ আবদার করতো সেটা সে সবকাজ ফেলে নিজ গরজে করে দিত। 

তনয়ের বাসার পরিবেশটা একটু অন্যরকম। বাসার সবাই জানত তাদের ছেলে একটু আলাদা। পাড়ার আর দশটা ছেলের মতন নয়। ছোটবেলা থেকেই সে নিজেকে লুকাতে চাইতো না। ছেলে হয়ে মেয়েলী স্বভাব, মেয়ের কাপড়ে পারিবারিক উৎসবে নাচ, এসব কারণে বহুবার তার বাবার দ্বারা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল ওকে অনেকবার। মঞ্চের নেশায় পেয়ে পড়াশুনা ওর কখনও সেভাবে হয়ে উঠেনি। ওর বয়সী ছেলেরা অনার্স, মাস্টার্স শেষ করে অনেকে চাকরীতে ঢুকে গিয়ে স্বাবলম্বী হয়ে গিয়েছে আর সে বসে ছিল পরিবারের উপর নির্ভরশীল হয়ে। মাঝে মাঝে অনেক রাগ হত, ওকে বলতাম, “তোমার জীবনটা মঞ্চ শেষ করে দিয়েছে। নিজের দিকে একটু দেখ। তোমার সাথের সবাই এমনকি নাটকের দলের ওরাও তাদের আখের গুছিয়ে নিয়েছে আর তুমি এখনও সেই আগের জায়গাতে আছো। তাদের জোগাড় করে দেয়া কিছু ফ্রিল্যান্স কাজ কর আর সেটা দিয়ে তোমার হাত খরচ চলে। বাসায় সেভাবে সাপোর্ট করতে পারো না। সেজন্য তোমাকে কথা শুনতে হয় তোমার দুলাভাইয়ের যিনি কিনা হঠাৎ করে খুব ধার্মিক হয়ে গেলেন। তোমাকে হেদায়েত করার চেষ্টা করতেন তোমার সেক্সুয়ালিটি নিয়ে কটু কথা বলে”। চাকরির চেষ্টা করতো অনেক কিন্তু সে সফল হতে পারেনি। দুর্ভাগ্য ওকে কখনও পিছু ছাড়েনি। শেষের দিকে ওর মা অনেক জোগাড়যন্ত্র করে আশা ইউনিভার্সিটিতে আইন শিক্ষা বিষয়ে অনার্সে ভর্তির ব্যবস্থা করেন। প্রাইভেট ছিল শেষ ভরসা, পাবলিকে পড়ার বয়স আর সময় আর ছিল না। 

১৪ই এপ্রিল, ২০১৬তে রঙধনু র‍্যালি করার প্ল্যান ছিল। বিগত কয়েকমাস ধরে বিভিন্ন হেট ম্যাসেজ, জীবননাশের হুমকি উপেক্ষা করেই তনয় আর জুলহাজ ভাই এই পরিকল্পনাতে এগিয়ে যান। সবাই রাজি থাকলেও আমি সেইবার বিপক্ষে ছিলাম রঙধনু র‍্যালির। কারণ চারপাশ থেকে তখন হুকি গুলোকে আসলেই বাস্তব বলে মনে হচ্ছিল আমার। জুলহাজের সাথে আমার শেষ দেখা পহেলা বৈশাখের আগের সপ্তাহের র‍্যালির জিনিসপত্রের ডেলিভারি দেয়ার সময়। ১৩ই এপ্রিল রাতে তনয় ফোন করে জানালো র‍্যালি বাতিল করা হয়েছে প্রশাসনিক বাধার কারণে। কিন্তু তারা যাবে সাধারণ মানুষের সাথে মঙ্গল-শোভা যাত্রার অংশ হয়ে। পরদিন সকালে ঢাকার অনলাইন ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গুলো শুরু করে রূপবানের ৪ জন কে কর্মী কে শাহবাগ থানাতে আটকের ঘটনা নিয়ে মুখরোচক গল্প ফাঁদা। আমরা যারা ভীতু তারা বাসায় বসে সেগুলা দেখছিলাম। আমজনতার ঘৃণা ভরা মন্তব্য পড়ছিলাম, ভয় পাচ্ছিলাম আর সংবাদ মাধ্যমের নিকুচি করছিলাম। ৪ জন নিরীহ সেই ছেলেগুলোকে বাঁচানোর জন্য শুধু তনয়সহ আর মাত্র ক’জন ছিল সারাটা দিন শাহবাগ থানাতে, আমারা না। 

২০১৬ এর ২৪শে এপ্রিল ওর ২৫ তম জন্মদিন ছিল। এর আগেরবারে সে ২টা কেক কেটেছিল বলে এবার জেদ ধরল কিছুই করবে না। শুধু আমার সাথে কাটাবে। জুলহাজ ভাই ডেকেছিল একসাথে উদযাপন করতে, ও গেলো না। রেস্টুরেন্টে আমাকে ট্রিট দিল একগাদা খাবার দিয়ে। এরপর আমাদের পছন্দের একটা সুপার শপে গেলাম এমনি ঘুরাঘুরি করতে। ওখান থেকে সে বেলিসিমো ব্র্যান্ডের নতুন একটা আইসক্রিম কেক খেতে চাইলো। এবার এটাই তার জন্মদিনের কেক হবে। বাসায় এসে দেখলাম খুবই বাজে খেতে! সেদিন সে থেকে যেতে বলল আমাকে রাতে। আমি গরমের জন্য থাকতে চাইনি। ও মন খারাপ করল। আমি বললাম আরেকদিন। আজকে ইলেক্ট্রিসিটির অনেক সমস্যা। পরদিন ছিল ওর পরীক্ষা। ভার্সিটি জীবনের ১ম সেমিস্টারের ফাইনাল। জুলহাজ ভাই আগে থেকে ঠিক করেন উনি আর তনয় ভারতে একটি কনফারেন্স এ যোগ দিবেন। মুম্বাইতে হবে সেটা। ভিসার জন্য তনয় ২৫তারিখ দেখা করবে তার বাসায়। সেদিন বেলা ১২টার আর কথা হয়নি আমাদের। দুজনের সাথেই যে সেদিনই শেষ কথা হবে সেটা সন্ধ্যা ৬ টার আগে আর বুঝতে পারিনি। 

বাংলাদেশী সহ বেশ কটি বিদেশী সংবাদ মাধ্যমে তনয়কে দেখানো হল জুলহাজ ভাইয়ের বন্ধু ও একজন নাট্যকর্মী হিসাবে। সেই ধারনা আজও পরিবর্তন হয়নি। রাগ হতো, অভিমান হতো কিন্তু বাস্তবতা চিন্তা করে চুপ হয়ে গেলাম। তনয়ের পরিবার তাদের সন্তানকে হারিয়েছে। তারা জানেন কেন তারা তাদের ছেলেকে হারিয়েছেন। আমরা হয়তো যুদ্ধ নিয়ে মাতামাতি করছি খুব কিন্তু যুদ্ধ পরবর্তী ধ্বংসযজ্ঞের চিন্তা করিনি। সমাজ এখন তাদের দিকে আঙ্গুল তুলে কথা বলে। প্রতিবেশী আর আত্মীয় স্বজনদের চোখে তনয় হচ্ছে একজন নাস্তিক তাই নাকি তাকে হত্যা করেছে জঙ্গিরা। ভাবতে পারি না আসলেই ওর পরিবারকে কিভাবে এখন দিন যাপন করতে হচ্ছে। 

তনয় চেয়েছিল মানুষ একটা সময় আমাদের বুঝতে পারবে, আমাদের আবেগের মূল্য দিবে। আমরা যে সাধারণ মানুষের চেয়ে কম নই সেটা সমাজ বুঝতে পারবে। এই জন্য কখনই সে নিজের পরিচয় লুকায়নি পরিবার বা কাজের ক্ষেত্রে। সে অনেক ধর্মভীরু ছিল। ধর্ম মতেই সে মনে করতো আমাদের হয়তো পরপারে দোষী সাব্যস্ত করা হবে আর দোজখেই আমাদের স্থান হবে। তারপরও সে চেয়েছিল বাঁচলে বাঁচার মতন করে বাঁচবে। সে চাইতো সবাই তাকে তার আসল পরিচয়ে জানবে। মাঝে মাঝে ওকে প্রশ্ন করতাম, তোমার কি মনে হয় তোমার এই খোলস না ধরার কারণে তোমার নাটকে বা টিভিতে ক্যারিয়ার হয়ে উঠেনি তেমনভাবে? সে উত্তর দিত না। অর্থহীন ভাবে মুচকি হাসত। সেই হাসির কোন মানে আমি কখনো বুঝে উঠতে পারিনি।

ব্যবচ্ছেদ করার সময় মৃত দেহের গলা থেকে নাভির নিচ পর্যন্ত চিরে ফেলা হয় এবং মাথার করোটি খুলে ফেলা হয়। ব্যবচ্ছেদ শেষ করার পর তার অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলো যেমন পাকস্থলী, কিডনি, হার্ট, লিভার ইত্যাদি বাহির করে লবণ পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয়। এরপর এই অঙ্গগুলো ডাক্তারি পরীক্ষা শেষে পুনরায় মৃতদেহের শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয় এবং পরিশেষে মৃতদেহের শরীর সেলাই করে দেয়া হয়।

তোমার কি মনে আছে একদিন সন্ধ্যায় একটা ঘাস-ফড়িং এসেছিল আমাদের ঘরে। আমরা বিছানায় বসে টেলিভিশন দেখছিলাম। আর ফড়িঙটা বার বার উড়ে উড়ে যাচ্ছিল। বরাবরই পোকাতে ভীষণ ভয় ছিল আমার সেজন্য ফড়িংটার ডানা কেটে দেওয়া হয়েছিল। আর তারপরও ভয় না কমলে ফড়িংটাকে জানালা দিয়ে ফেলে দেওয়া হল। তুমি খুব আফসোস নিয়ে বলেছিলে “ইস! মরে যাবে ফড়িং টা।” এখনো ভর-সন্ধ্যায় মাঝে মাঝে ঘরে ফড়িং আসে, পিঠে গজানো ডানা ছিঁড়ে যাওয়ার ভয় আমাকে তাড়া করে বেড়ায়!  

নীল আকাশটা আজ ঘুটঘুটে কালো। কোথাও কোন তারাও দেখা যায় না। সারাদিন অনেক বৃষ্টি হল। এমন দিনে আমরা রিকশায় করে মাঝে মাঝে একসঙ্গে বাড়ি ফিরতাম। দুই বছরের বেশী হল আজ সেই পথ ধরে হাঁটা হয়নি। আমি প্রায়ই ভাবি আমরা যেই বাসাতে থাকতাম সেই বাসার সামনে দিয়ে একবার হেঁটে যাব। শুনেছি এখন সেখানে আর কেউ থাকেনা। গুমোট অন্ধকারে শূন্য ঘরের আকাশী দেয়ালগুলো কি আমাদের কথা মনে করে?

কিংবা যেখানে ওরা চাপাতি দিয়ে তোমাকে আঘাত করল, সেখানে কি এখন কোন রক্তের চিহ্ন আছে? আমার প্রায়ই মনে হয় সেখানটায় গিয়ে একবার ভাল করে খুঁজে দেখি। সংবাদমাধ্যমে জেনেছি যারা সেদিন বিকেলে এসেছিল, তারা কেউ এখনো ধরা পড়েনি। আচ্ছা তারা কি খুন করবার পর হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলেছিল? তাদের শার্টের হাতায় কি কোন রক্তের দাগ এখনো লেগে আছে? এটা মেনে নিতে খুব কষ্ট হয় যে ইতিহাসের পাতায় এই রক্তের কথা কোনদিন লেখা হবেনা। কেমন করেই বা লেখা হবে? এই রক্ত তো আর আমাদের তথাকথিত সমাজ ব্যবস্থার কারও জন্য সম্মান বয়ে আনেনি। স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজে বলেছেন যে সরকার এলজিবিটি অধিকার সমর্থন করবে না যারা ব্লগারদের মত ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার জন্য দায়ী। আসলেই কি কুপিয়ে হত্যা শব্দটার অর্থ উনি অনুভব করতে পারেন? কিংবা কে জানে, আমি হয়তো মানুষ নই, মানুষগুলো অন্যরকম। মানুষগুলো সাপে কাটলে দৌড়ে পালায় ; 

সব কিছু আগের মতই আছে। প্লেট, গ্লাস, ফুলদানি, বিছানা, জুতা-মোজা, চিরুনি, আয়না। এই একবছরে এই সমাজ সংসারের কোন কিছুই বদলে যায়নি। কলের পুতুলের মত সব আগের মতই আছে।  তোমাকে মেরে ফেলবার পর সব সংবাদ মাধ্যমে লেখা হল যে তুমি একজন নাট্যকর্মী। জুলহাজের বন্ধু। সবাই চেপে গেল সমকামীদের অধিকার আদায়ে তোমার সংগ্রামের কথা। হয়ত তোমার পরিবার থেকেই বিষয়টা গোপন করে ফেলা হল। ছোটবেলায় বইয়ে পরিবার আর সমাজের সংজ্ঞা পড়েছিলাম। এই এত বছর পরে সংজ্ঞাগুলো অনেক কঠিন মনে হয় আজকাল।  

মৃত্যুর পরেও আমাদের সমাজ সমকামিতার স্বীকৃতি তোমাকে দিল না। এই নিয়ে তুমি মন খারাপ করোনা। অনুচ্চারিত থাক না হয় কিছু ক্রোধ। আকাশে উড়ে যাক হলুদ ফানুশ। আর জঙ্গলের ভুল পথে ফুটে থাক কিছু আলোর ফুল। 

তোমার সাহসিকতার কথা ভাবতে কেমন অন্যরকম লাগে। আমি নিজে এখনো তোমার কবরের মুখোমুখি হবার মত সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারিনি। কিংবা কে জানে, কষ্ট বয়ে বেড়ানোর মাঝেও হয়ত কোন সুখ লুকান থাকে। 

তোমার ব্যাগে নাকি কয়েকদিন ধরেই একটা মুগুর থাকত। তোমার লাশ যারা দেখেছে, এমন একজন আমায় সেদিন বলছিলেন, তোমার হাতের মাঝখানটা ছিল কাটা, দুই ভাগ করা। তুমি কি হাত দিয়ে চাপাতির আঘাত থেকে আত্মরক্ষার চেষ্টা করছিলে? আমি শুনেছি ওরা তোমার মেরুদণ্ড আর মাথা আলাদা করে ফেলেছিল। চারিদিকে কেবল রক্ত আর রক্ত, তার মধ্যে ধস্তাধস্তি, কিছু পায়ের ছাপ। শুনে একটুও ভয় লাগেনি আমার। এই কথা শুনবার পর থেকে আমার কেবল একটা কথাই ঘুরে ফিরে মনে হত। অনেকদিন আগে তুমি একবার বলেছিলে একটা নাটকের দৃশ্যের মহড়ায় গিয়ে তুমি পিঠে ব্যথা পেয়েছিলে। তারপর থেকে মাঝে মাঝেই তোমার পিঠে ভীষণ ব্যথা হত। 

ছোট বাচ্চারা যেভাবে কোলবালিশ নিয়ে ঘুমায়, তুমিও সেভাবে ঘুমাতে। সেই ঘুমের ভঙ্গিতেই তোমার লাশ পড়ে ছিল মেঝেতে। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে রক্তের বিছানায় শুয়ে শুয়ে তুমি কি ভাবছিলে? 

এটা মেনে নিতে খুব কষ্ট হয় যে এই দেশে কোনদিন ওই অপরাধীরা ধরা পড়বে না। দূর থেকে তারা কেবল দেখতে থাকবে আমাদের। কিংবা কাছে থেকে। রাষ্ট্রের কাছে এই মৃত্যু কেবল মাত্র একটা ছোট্ট সংখ্যা ছাড়া আর কিছু না। 

পৃথিবীব্যাপী সমকামী জনগোষ্ঠীকে বারবার প্রকাশ্যে আসার জন্য উৎসাহিত করা হয়। তুমি নিজেও তোমার ফেসবুক থেকে শুরু করে থিয়েটার কিংবা পরিবার – সবক্ষেত্রেই তোমার পরিচয় গোপন না রেখে কাজ করে গেছ। অথচ তোমার মৃত্যুর পর সব কেমন বদলে গেল। আমরা সবাই এখন সর্বদা ভীত সন্ত্রস্ত, যোগাযোগ মাধ্যমে গোপন থাকার কৌশল রপ্ত করায় আমরা এখন অনেক ব্যস্ত। কোথাও যেন ভুল করেও আমাদের কোন চিহ্ন না রয়ে যায়। আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে যে দূর থেকে এসব দেখে তুমি কি মুচকি মুচকি হাসো? 

গত সপ্তাহে আমি বৈষম্য বিলোপ আইন বিষয়ক একটা আলোচনায় অংশ নিতে গিয়েছিলাম। টেবিলের আরেক মাথা থেকে আমাকে পরিষ্কার বলে দেয়া হল সরকার এমন কিছু করতে পারবে না যা ৩৭৭ ধারার বিপক্ষে যাবে। এই অশান্ত পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে না পেরে তারা এলো জি বি টি শব্দটা শুনতেও এখন নারাজ। সবকিছু এখন কেমন যেন অনেক অন্তঃসার শূন্য মনে হয়। আরেকটু বেশী সম্মান কি রাষ্ট্রের কাছে তোমাদের প্রাপ্য ছিল না? 

কাল রাতে আমাদের নিয়ে একটা স্বপ্ন দেখলাম। একটা ঝিম ধরা বিকেল। খেয়া ঘাটে একটা পরিত্যক্ত নৌকা বাঁধা। তাতে থৈ থৈ করছে জল। তার উপরে মেঘের ছায়া। জল ভরা শ্রাবণের ঘন কাল মেঘ। এরপরেই দেখলাম একটা বদ্ধ ঘর। কিছু পুড়ে যাওয়া সাদা মোমবাতি। আগরবাতির তীব্র গন্ধ। আর বাক্সের তলা থেকে খুঁজে বের করা কিছু পুরনো স্মৃতি। 

ধীর পায়ে যখন দুপুরগুলো আমার নিঃসঙ্গতার দিকে আজকাল এগিয়ে আসে, তোমার কথা যখন আমার অনেক মনে হয়, আমি প্রায়ই তখন আমাদের পুরনো মেসেজ গুলো পড়ে দেখি। যেখানে আমাদের পরিচয় থেকে শুরু  করে অনেকদূর পর্যন্ত পথচলার একটা ঠিকানা পাওয়া যায়। তোমার কি মনে আছে অতোদিন আগের কথা? 

আমাদের জীবনে ভালোবাসা এসেছিল অসম্ভব পাওয়া হয়ে। ভালোবাসা অতিথির মত এসে আমাদের জীবনে কয়েকটা সুন্দর দিন কাটায়, তারপর চলে যায়। 

আমি জানিনা তুমি এখন কোথায়? লুব্ধকের চাইতেও উজ্জ্বল কোন নক্ষত্র হয়ে, বহু আলোকবর্ষ দূরে বসে তুমি কি আমাদের দেখতে পাও? আজ মনে হয় আসলেই অমাবস্যা। বারান্দায় অনেকক্ষণ বসেও আকাশের চাঁদটাকে দেখতে পেলাম না। আর আমাদের দুজনের, একান্তই আমাদের যেই চাঁদটা ছিল, সে তো অনেক আগেই আমরা হারিয়ে ফেলেছি। তারপরও আমার কেন যেন মনে হয়, নিশ্চয়ই তোমার সাথে আমার খুব তাড়াতাড়ি একদিন দেখা হবে। হয়ত রাস্তায় কিংবা কোন ভিড়ের মাঝে। হুট করে আমার চারপাশ ছেয়ে যাবে ধুসর ঘন কুয়াশায়। আমাকে আরও বেশী অপ্রস্তুত করে দিয়ে অল্প হেসে তুমি জানতে চাইবে, “আপনি কেমন আছেন?”

প্রাণের মানুষ
ভ্যালেন্টাইন সৈকত

প্রথম পরিচয় সেই ২০১২ সালে এরপর থেকে জুলহাজ ভাইকে আমি পেয়েছি আমার জীবনের প্রায় সব প্রয়োজনে ব্যক্তিগত থেকে শুরু করে এলজিবিটি কাজ - প্রায় সব ব্যপারেই আমি তার সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতাম। একজন এলজিবিটি ব্যক্তি হিসেবে আমাদের অধিকার নিয়ে কাজ করার অনুপ্রেরণা, উৎসাহ আর সুযোগ আমি তার কাছ থেকেই পেয়েছিলাম জুলহাজ ভাইকে দেখেই আমি সাহস পেয়েছি আমার নিজের পরিবার-বন্ধুদের কাছে নিজেকে একজন গে হিসেবে প্রকাশ করার তার কাছ থেকেই আমি জেনেছিলাম রূপবান এবং বব-এর কথা আমি মনে করি রূপবান এবং বব আমারই একটা অংশ আর আমি তাদের একটা অংশ

২০১৬ সালে রূপবানের ইউথ লিডারশীপ প্রোগ্রামে গিয়ে পরিচয় হয় মাহবুব রাব্বি তনয় ভাইয়ার সাথে। অন্য সবার থেকে তনয় ভাইয়ার সাথে আমার একটু বেশিই আন্তরিকতা তৈরি হয় আমি তনয় ভাইয়াকে বলি যে ওনার অভিনীত "আত্মত্যাগ" শর্ট ফিল্মটি আমি আমার এলজিবিটি ইউটিউব চ্যানেল "ভ্যালেন্টাইন" আপলোড করবো। তনয় ভাই একটা মিস্টি হাসি দিয়ে বলেছিলেন অবশ্যই দিয়ো এতে আরো বেশি মানুষ ফিল্মটা দেখার সুযোগ পাবেপরে যখন লিডারশীপ ট্রেনিং-এর সার্টিফিকেট বিতরণ করা হচ্ছিলো তখন আমরা দু’জন ম্যাচ করে হলুদ রঙের পোশাক পরেছিলামআমি পরেছিলাম হলুদ পাঞ্জাবী আর তনয় ভাই হলুদ টিশার্টখুব অল্প সময়ে আমরা খুব আপন হয়ে গিয়েছিলাম

কথাগুলো লিখতে লিখতে এখন আমার চোখে পানি চলে এসেছে।  আমার চোখের সামনে দৃশ্যমান সেই দিনের ঘটনাগুলোযেদিন আমি ইউথ লিডারশীপ ওয়ার্কশপ শেষ করে চলে আসবো সেদিন আমার কাছে আমার ডেবিট কার্ড ছিল কিন্তু ক্যাশ টাকা ছিলো না আর কুমিল্লার আলেখারচর-এর আশেপাশে টাকা তোলার কোন এটিএম বুথও ছিলো কি না আমি জানতাম না। আমি জুলহাজ ভাইকে ফোন করে বলি আমার প্রবলেমের কথা। তিনি বলেছিলেন তুমি রেডি হয়ে বাসস্টপে যাও আমি সবাইকে নিয়ে ওখানে আসবো আর তোমার বাড়ি যেতে যা টাকা লাগবে তুমি আমার কাছ থেকে নিও কিন্তু আমি বাসস্টপে গিয়ে দেখলাম সেখানে একটা এটিএম বুথ আছে। বাস যখন ছেড়ে দিবে তখন হঠাৎ দেখি জুলহাজ ভাই তনয় ভাই সহ আরও সবাই বাসস্টপে আসছে। জুলহাজ ভাই আমাকে দেখে ইশারা করলো আর আমিও ইশারায় দেখিয়ে দিলাম যে টাকার ঝামেলা মিটে গেছে জুলহাজ ভাইসহ সবাই আমাকে হাত নাড়িয়ে বিদায় জানালো ! সেই দেখাই যে জুলহাজ ভাই আর তনয় ভাইয়ের সাথে আমার শেষ দেখা হবে তা কি আমরা কেউ ভেবেছিলাম?

জুলহাজ ভাইয়ের সেই হাসিমাখা মুখটা এখনো আমার চোখের সামনে ভেসে উঠে বৈশাখের রংধনু ্যালীতে যাওয়ার কথা ছিলো কিন্তু পারিবারিক সমস্যার কারণে যেতে পারিনি। এরমধ্যে আমি আমার কিছু এলজিবিটি সম্পর্কিত শৈল্পিক কাজ নিয়ে জুলহাজ ভাইয়ের কাছে যাবো বলেছিলাম। সেটাও আর হোলনা !

২৫শে এপ্রিল সন্ধ্যায় এক বড় ভাইয়ের ফোনে শুনলাম যে আমাদের সবার প্রাণের মানুষ, আমার পথপ্রদর্শক, আমার আদর্শ,  আমার ভাই জুলহাজ মান্নান আর তনয় ভাই আর নেই আমি ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। সাথে সাথে টেলিভিশন অন করি আর খবর দেখে নিশ্চিত হই

কি যে এক অস্থির বিভীষিকাময় সময় ছিল সেটা! কি করব কি বলব কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলাম না। কান্না আসছিলো কিন্তু কাঁদতেও পারছিলাম না এর মধ্যে কম্যুনিটির অনেক এলজিবিটি লেখকরা, যাদের লেখা আমার অনলাইন ভিত্তিক এলজিবিটি ম্যাগাজিন "ভ্যালেন্টাইন" প্রকাশিত হয়েছিলো, তারা সেখান থেকে তাদের লেখা মুছে ফেলতে আমাকে অনুরোধ জানায়। খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল তারা। সাথে সাথে আমিও খুব ভয় পেয়ে গেলাম কারণ বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় এলজিবিটি গল্পের পেইজটা আমার। তাই আমিও নিজেকে নিরাপদ মনে করতে পারিনি সব সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়ে নিজেকে লুকিয়ে ফেলি !

কিন্তু আমার মাঝে যে আছে জুলহাজ ভাই আর তনয় ভাই-এর আদর্শ!  তাদের এই আত্মত্যাগকে আমি কিভাবে ভুলে যাবো? আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর কবিতার ৪টা লাইন বার বার মনে পড়তে লাগলোঃ

"অসত্যের কাছে কভু
নত নাহি হবে শির
ভয়ে কাপে কাপুরুষ
লড়ে যায় বীর"

কিছু দিন পর মনে মনে ভাবলাম, না এভাবে থেমে গেলে চলবে না।  আমরা থেমে যাবো না। এই শোককে আমাদের শক্তিতে পরিণত করতে হবেসাবধানে আমাদের আবার সামনে এগিয়ে যেতে হবেতাদের মৃত্যু আমাদের চলার পথের গতি ধীর করে দিয়েছে বটে কিন্তু তারাই আমাদের অনুপ্রেরণা, সামনে চলার সাহস, আদর্শআমি আবার আমার এলজিবিটি অনলাইন ম্যাগাজিন পাবলিশ করলাম, গ্রুপ ওপেন করলাম, এলাকার এলজিবিটি ব্যক্তি যারা আছে তাদের সাথে ছোট ছোট মিটিং-এর ব্যবস্থা করলাম

যেকোন এলজিবিটি আলোচনা শুরু করার আগে আমি জুলহাজ ভাই তনয় ভাইয়ের কথা সবাইকে বলি, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করি
আমি মনে করি আমার ভাইয়েরা আমাদের জন্য জীবন দিয়ে গেছে।  এখন আমাদের দায়িত্ব তাদের অসম্পুর্ন কাজগুলোকে পরিপুর্নতা দেওয়াআমরা থেমে গেলে তাদের এই আত্মত্যাগ বৃথা যাবে
কিছু অসৎ মানুষ হয়তো কিছু সময়ের জন্য থামিয়ে দিতে চেষ্টা করবে কিন্তু আমাদের পথচলা থেমে যাবে না তাদের এই আত্মত্যাগ আমাদেরকে শিখিয়ে দিয়ে গেছে আরো বেশি সাবধানতার সাথে, আরো বেশি দূরদর্শিতার সাথে আমাদের কাজকে, আমাদের আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে দ্রুত হোক আর ধীরে আসল কথা যেভাবেই হোক আমরা এগিয়ে যাবো থেমে থাকবো না আমরা যে যেখানেই থাকিনা কেন আমাদের সবার যার যার অবস্থান থেকে কাজ করে যাবো আমি গে এটা আমার সেক্সুয়াল পরিচয় আর আমি মানুষ এটাই আমার আসল পরিচয়

 ভ্রমণ - অণু ইসলাম 

তনয়, তুমি বিশ্বাস করতে আত্মা অবিনশ্বর। এখন আমারও মনে হয় তা। মনে হয়, ২০১৬ সালের ২৫শে এপ্রিল তোমার শরীরটা হারিয়ে গেছে, কিন্তু তুমি আছ আজো আমাদের মাঝে।  

আজ ২৫শে মার্চ, ২০১৭। ঠিক এক বছর আগের সন্ধ্যায় তোমার সাথে শেষ দেখা, শেষ আড্ডা, শেষ ভ্রমণ। 

ভ্রমণ! এটাকে কি ভ্রমণ বলা যায়? অনেক সময়ই আমরা বিভিন্ন আড্ডা বা অনুষ্ঠান শেষে একসাথে ফিরতাম। একটু বেশি সময় কথা বলার জন্য আমরা রিক্সায় উঠতাম। তুমি কখনো শেওড়াপাড়াতেই নেমে যেতে, কখনো বা আমার গন্তব্য মিরপুর ১২ পর্যন্ত এসে আবার ফিরতে নিজের ঠিকানায়। পান্থপথ থেকে মিরপুর ১২ পর্যন্ত পথটুকু একসাথে যাওয়াকে ভ্রমণ বলা যুক্তিযুক্ত কি না জানি না। তবে যদি পথের বিস্তৃতিকে বিবেচনা না করে আমাদের আলোচ্য বিষয়কে বিবেচনা করা হয় তবে এটা অবশ্যই ভ্রমণ। দুজনার মানসলোকে ভ্রমণ।  

এরকম অনেকগুলো ভ্রমণের মধ্য দিয়েই আমাদের চেনাজানাটুকু হয়েছে। শুধু দুজনায় কাটানো সময় বলতে এই পথটুকু অতিক্রমের কালটুকুই।  

আজ সেই পথটার কোল ঘেঁষেই শুয়ে আছ তুমি, শেষ শয্যায়। এই ব্যস্ত নগরীর একটি ব্যস্ত প্রধান সড়কের পথেই ছায়াঘেরা এক কবরস্থানে। অন্যান্য কবরগুলো চারিধার ঘেরা নীল বা হলুদ রঙের বেষ্টনীতে। অথচ তোমার শয্যার চারপাশটা ঘেরা গোলাপি রঙের বেষ্টনীতে। প্রথমে ভেবেছিলাম তোমার স্বজনরাই বোধ হয় তোমার পছন্দের এই রঙটাতে রাঙিয়েছে তোমার শয্যা। কিন্তু পড়ে জেনেছি, সেটা নয়। এখানকার কর্মীরাই এই রঙটা বেছে নিয়েছে। 

রঙ তুমি খুব ভালবাসতে। নানা রঙে সাজাতে চাইতে জীবনকে। নানা রঙের নানা মাত্রায় পৃথিবীকে উল্টেপাল্টে দেখতে তুমি। তোমার চব্বিশ বছরের নানা রঙে রাঙানো জীবন শেষ হয়ে গেলো ঘাতকের নির্মম আঘাতে। সেই সব ঘাতক, যারা নিজেদের সৃষ্টিকর্তা মনে করে সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টি বিচারের ভার ভার নিজেদের হাতেই তুলে নেয়।  

অথচ প্রতিটি কাজেই তুমি সৃষ্টিকর্তাকে স্মরণ করতে। নামায পাঁচ ওয়াক্ত পড়া না হলেও নামাযের মূল শিক্ষাটা ছিল তোমার প্রাত্যহিকতায়। ঈদুল আযহায় পশু কুরবানির সমস্ত আয়োজন নিজের হাতে করতে। পশু কেনা থেকে শুরু করে গরীবদের মাঝে কুরবানির পশুর গোশত বিতরণ করা পর্যন্ত সবকিছু নিজের হাতে করতে ভালবাসতে। প্রতিটি কাজের শুরুতে তুমি নির্ধারিত দোয়া পড়তে। আমি অবাক হতাম – এত দোয়া মনে রাখো কিভাবে? তুমি মিষ্টি হেসে বলতে – আগ্রহটাই সব। নইলে আমরা এত গান, এত কবিতা কিভাবে মনে রাখি বলেন?  

বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তুমি এমন অনেক কথাও বলতে যেগুলো পরস্পরবিরোধী। আমি আর তোমার প্রেমিক – যে আমার খুব ভালো বন্ধু – দুজনে অনেক হাসাহাসি করতাম এটা নিয়ে।  

আমরা খুব হাসতাম ভূতপ্রেতে তোমার বিশ্বাসের গভীরতায়। লালমাটিয়ার সেই বাসাটাতে নাকি ভূত ছিল। বাসাটার একটা ঘর বাড়িওয়ালা আসবাবে ভরা ছিল। তালা দেয়া থাকতো সেটা। সেই ঘরে না কি ভূত ছিল। বিশ্বাস করি বা না করি মুগ্ধ হয়ে আমরা তোমার ভূতের গল্প শুনতাম। কি সুন্দর করেই না বলতে তুমি! তোমার কণ্ঠস্বর, শব্দচয়ন আর অভিব্যক্তি আমাদের প্রভাবিত করতো।  

অন্যকে প্রভাবিত করতে পারার বিষয়টি তুমি নিজেও জানতে এবং এটা নিয়ে এক ধরণের অহংবোধও ছিল তোমার।  

আচ্ছা, তুমি কি কখনো টের পেয়েছ আমাদের হাসাহাসির বিষয়টা? আজ খুব জানতে ইচ্ছে করছে। যদি টের পেতে তবে কি তোমার ঐ মিষ্টি হাসিটা মলিন হতো? সেই হাসি – যা নিমেষেই মন ভালো করে দিত। 

তোমার সাথে পরিচয়ের প্রথম ক্ষণটাতে তোমার এই হাসিটাই তোমার প্রতি আগ্রহী করেছিল। লালমাটিয়া সেই বাসায় প্রথম দেখা। ‘প্রণয়নামা’ নামের একটি অনুষ্ঠানের রিহার্সালে। অবশ্য পরে তুমি বলেছিলে, আমাকে প্রথম দেখেছিলে উত্তরায় একজনের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে। পরিচয় হয়নি আমাদের। তাই আমার মনে ছিল না সেটা। 

দেখা হলেই ঝলমলে হাসিতে মুখ ভরিয়ে তুমি সম্ভাষণ জানাতে। তবে যখন খুব বিরক্ত হতে বা রেগে যেতে কারো ওপর, তখন ঐ হাসিটা মুছে গিয়ে মুখটা থমথমে হয়ে যেত। তোমার রাগের প্রকাশ দেখিনি আমি। তবে তোমার মুখটা খুব খুব কঠিন হতে দেখেছিলাম দু’বার। একবার তোমার জনকের কথা বলতে গিয়ে। তারপর আর কখনো আমরা ঐ প্রসঙ্গে কথা বলতাম না। আরেকবার তোমার ত্রিভুজ প্রেমের অদ্ভুত একটা টালমাটাল সময়ে। যখন তুমি তোমার সেই সময়ের প্রেমিকের কাছ থেকে তোমাদের প্রেমের সম্পর্কের প্রকাশ চাইছিলে। তার সঙ্গে তোমার সম্পর্কের স্বরূপ জানতে চাইছিলে। খুব কঠিন মুখে তুমি প্রশ্ন তুলেছিলে – তাহলে ওনার সঙ্গে আমার সম্পর্কটার নাম কি? আমি কে তার? বন্ধু? প্রেমিক? না কি রক্ষিতা? 

তোমার রাগী, ব্যথাহত, আপাত অসহায় মুখটার দিকে আমি চাইতে পারছিলাম না। উত্তর দেওয়া তো পরের কথা।   

তুমি উতলা হয়েছিলে তোমাদের সম্পর্কের স্বীকৃতির জন্য। পাওনি বলে গভীর হাহাকার ছিল তোমার মনে। কিন্তু আমি অবাক হয়েছি পরবর্তীতে ত্রিভুজের তৃতীয় বিন্দুর সাথে তোমার সম্পর্ক যখন থিতু হল তখন সেই সম্পর্কের ঘোষণা দিতে চাইলে না। মনে পড়ে একটা রিক্সা ভ্রমণের পুরোটা সময় আমরা এটা নিয়েই কথা বলেছিলাম? তখন তুমি বলেছিলে তোমার প্রেমের সম্পর্ক যখন ঘোষিত হয় তখন তোমার প্রেমিকের মনে তোমার জন্য আকুলতা আর আগের মত থাকে না। অতীতে সবগুলো সম্পর্কের ক্ষেত্রে সেটাই ঘটেছে। তাই তুমি ভয় পাচ্ছ। তোমার ভয়টাই সত্যি হল অন্যভাবে। সম্পর্কের স্বীকৃতির পর প্রেমিকের আকুলতা হারাল না কিন্তু তুমি হারিয়ে গেলে পৃথিবী থেকে। 

একবারই কাঁদতে দেখেছিলাম তোমাকে। তোমাদের ত্রিভুজ প্রেমের জটিল সময়টায় তোমাদের তিনজনকেই কাঁদতে দেখেছি আমি। তুমি এবং তোমার দুই প্রেমিক – তিনজনেরই বন্ধু এবং বড় ভাই আমি। তাই তিনজনকে অনেক কথা বলতে আমাকে। অনেক প্রশ্নের উত্তর চাইতে। কিন্তু কি বলবো আমি? তোমরা তিনজনই যার যার জায়গায় সঠিক ছিলে, আবার তিনজনেরই ভুলও ছিল বলে আমার মনে হতো। কিন্তু কোন উত্তর আমার জানা ছিল না। খুব অসহায়বোধ করতাম। তিনজনকেই আমি সুখী দেখতে চাইতাম। কিন্তু তা সম্ভব ছিল না। যেহেতু তোমার প্রেমিকদ্বয় আমার পুরনো বন্ধু এবং তাদের বন্ধুত্বের মাঝখানে এসে পড়েছিলে তুমি সেহেতু আমি তোমাকেই দায়ী করতাম এই পরিস্থিতির জন্য।  

তুমি কি খুব রাগ করেছ একথা জেনে? খুব স্বার্থপর ভাবছ আমাকে? ভাবো। আমি আসলেই স্বার্থপর ছিলাম। আমি অনেককে বলেছিও তুমি আসলে ‘Attention Seeker’। শুধুমাত্র এই কারণেই সব জটিলতার সৃষ্টি হচ্ছে। 

অবাক করা বিষয়টা হল আমাদের শেষ দিনের ভ্রমণটায় তুমি নিজের সম্পর্কে এই কথাটা বলেছিলে। তুমি বলেছিলে – ‘হ্যাঁ, আমি attention seeker। আমি সবসময় চাই আমার প্রেমিকের পূর্ণ মনোযোগ।  

শুধু তোমার প্রেমিকের নয়। সবার মনোযোগ পেয়ে গেলে তুমি ঘাতকের আঘাতে তোমার মৃত্যুতে।  

কিন্তু এমন মনোযোগ কি তুমি চেয়েছিলে? 

তোমার শেষ শয্যার পাশ ঘেঁষেই আমার যাওয়া আসা। বাস বা রিক্সা থেকে তাকিয়ে থাকি ওদিকটায়। একটিবার তোমার হাসি মুখটা দেখতে ইচ্ছে হয়। ইচ্ছে হয় আরও একবার তোমাকে নিয়ে রিক্সা ভ্রমণ করি। বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলি। মনে হয় এই বুঝি তুমি আমাকে দেখে হাসিমুখে সম্ভাষণ জানাবে – ‘আস সালামু আলাইকুম, ভাই’।  

কিন্তু হায়! জীবন খুবই নির্মম।  

তাই আমাকেই বলতে হয় – ‘আস্ সালামু আলাইকুম ইয়া আহ্ লাল কুরুব’।  

‘হে কবরবাসী, আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক’।